ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলিতে সারাহ রোকসানা পিনু নামে এক দন্তচিকিৎসককে হত্যা মামলায় জুতার ছাপের সূত্র ধরে গ্রেফতার তার স্বামী সোহেল রানার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (৩ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদ রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু বকর সিদ্দিক এ তথ্য জানান।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দক্ষিণখানের বাসা থেকে দন্তচিকিৎসক সারাহ রোকসানা পিনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ জানায়, বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা ওই নারীকে হত্যা করে এবং ঘরের জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। তবে জানালার যে অংশে গ্রিল কাটা হয়, সেই জানালার ভেতরের অংশের বারান্দায় একটি জুতার ছাপ পান সিআইডির সদস্যরা। এরপর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়। ওই জুতা ছিল সোহেল রানার।
পিনুকে খুনের ঘটনায় তার বোন সারাহ সুলতানা পলি শুক্রবার অজ্ঞাতদের আসামি করে এ মামলা করেন।
ওই হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে নেমে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হয় সোহেল রানাকে। শনিবার সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই হাবিবুর রহমান।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাৎ আসামিকে কারাগারে পাঠিয়ে সোমবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেন।
সোহেল রানা উত্তরা পশ্চিম থানার ৭ নম্বর সেক্টরে ডেভেলপার কোম্পানিতে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন।
জুতার ছাপের মিল পাওয়াসহ ৯ কারণ দেখিয়ে সোহেল রানার রিমান্ড আবেদন করা হয়। অপর কারণগুলো হলো–
১. মামলায় ঘটনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে, সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে বেলা ৩টা। যে জানালার গ্রিল কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়, তার অপর পাশে অন্য একটি ছাদ লাগোয়া। ওই ছাদ বেশ প্রশস্ত ও খোলা। এর চারপাশে অনেকগুলো বহুতল ভবনের বাড়ির জানালা, বারান্দা ও রান্নাঘর দৃশ্যমান। দিনের বেলায় ঘটনা ঘটে। আশপাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, কেউই ওই সময়ে ঘটনাস্থলের জানালার পাশে কোনও ব্যক্তিকে গ্রিল কাটতে দেখেননি বা গ্রিল কাটার শব্দ শুনতে পাননি।
২. ঘটনাস্থলের জানালার যে অংশে গ্রিল কাটা হয়েছে সেই জানালার বাসার ভেতরের অংশের বারান্দায় একটি জুতার ছাপ পাওয়া যায় এবং ভুক্তভোগীর বাসায় পাওয়া একজোড়া জুতার ছাপের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পায় সিআইডি ক্রাইমসিন টিম। ওই জুতা সোহেলের রানার বলে সে স্বীকার করেছে। তবে জানালার গ্রিলের বিপরীত পাশের ছাদে কোনও ধরনের জুতার বা পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি।
৩. পিনুর মেয়ে হাসিন ওয়ামীর ভাষ্য মতে, তার মা প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানা থেকে উঠে তার ইউনিফর্মের দিকে তাকাতো এবং তারপর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে আবার বিছানায় ঘুমাতে যেতো। কিন্তু ঘটনার দিন তার মা বিছানা থেকে ওঠেনি এবং দরজাও লাগাতে আসেনি। তার বাবা তাকে বলেছিল, তার মা তার বাবাকে বলেছে, সে পরে উঠে দরজা লাগাবে। কিন্তু হাসিন ওয়ামী ওই দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তার মায়ের কোনও নাড়াচাড়া বা কথা বলতে শুনতে বা দেখতে পায়নি।
৪. হাসিন ওয়ামী যখন স্কুলে, তখন তার বাবা তাকে ঘটনার কথা জানায় এবং তার বাবা কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে বিছানার চিৎ হয়ে শোয়া অবস্থায় দেখতে পান। কিন্তু তিনি এই অবস্থায় তার স্ত্রীকে কোনও ধরনের স্পর্শ কিংবা চিকিৎসা দেওয়ার কোনও তৎপরতা দেখাননি। স্বামী হিসাবে স্ত্রীর এই ক্রান্তিকালে কোনও ধরনের সাহায্যের চেষ্টা না দেখিয়ে থাকা খুবই সন্দেহজনক।
৫. টনাস্থলে দুইটি লিভিংরুম রয়েছে। একটি লিভিং রুমে ভিকটিমের মরদেহ ও তার দুটি আলমারি ছিল। এই আলমারিগুলো খোলা ও এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। কিন্তু অপর একটি কক্ষে আসামির ব্যক্তিগত একটি প্লাস্টিকের আলমারি ছিল যা সম্পূর্ণ বন্ধ ও অক্ষত অবস্থায় ছিল।
৬. জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা স্ত্রীর প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ ২০ বছর সংসারকালীন অবস্থায় তার স্ত্রী তাকে সর্বদা অপমান, অবিশ্বাস, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতো বলে প্রকাশ করেন। জিজ্ঞাসাবাদকালে আরও জানান, তিনি যে বাড়িটিতে থাকেন সেই বাড়িটি ভুক্তভোগীর নামে রেজিস্ট্রেশন করা আছে।
৭. জিজ্ঞাসাবাদকালে সোহেল রানা জানান, তিনি তার স্ত্রীর বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতেন এবং তার স্ত্রী সারা রাত মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে কথা বলতেন। এ ক্ষেত্রে সোহেল তাকে বিভিন্ন সময় নিষেধ করলেও ভুক্তভোগী মেনে নিতেন না।
৮. জিজ্ঞাসাবাদকালে ভুক্তভোগীর বোন ও বোনের মেয়ে জানান, পিনু প্রায়ই তাদের বলতো, সোহেল অন্য অনেক মেয়ের সঙ্গে বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছিল এবং তাকে এ বিষয়ে নিষেধ করলে সে শারীরিকভাবে আঘাত ও প্রায় সময় তাকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিতো। ঘটনার কিছুদিন আগে ভুক্তভোগী তার বড় বোন সারা সুলতানা পলিকে ফোনে বলেছিলেন, আপা আমি যদি কোনও দিন মারা যাই তাহলে বুঝবে, আমার স্বামী আমাকে মেরে ফেলেছে এবং তুমি নিজে বাদী হয়ে থানায় মামলা করবে। ভিকটিম তার বোনদের বহুবার জানিয়েছে, তার স্বামী তাকে যেকোনও সময় মেরে ফেলতে পারে।
৯. পিনুর শোয়ার রুমের আশেপাশে চারটি স্বর্ণ রাখার খোলা বক্স পড়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু তার শয়নকক্ষের কাঠের আলমারিতে থাকা একটি ব্যাগে অনুমান ২০-২৫টি স্বর্ণের খালি বক্স জিপার লাগানো অবস্থায় দেখা যায়, যা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটের দিকে সোহেল রানা পিনুকে একা বাসায় রেখে মেয়ে ওয়ামীকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে যায়। কেউ আনতে না যাওয়ায় বিকালে ওয়ামী বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে দেখে ঘরের দরজা খোলা, তবে চাপানো।
এজাহারে বলা হয়, ওয়ামী দেখতে পায়, তার মা খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার মুখের ওপর বালিশ রাখা। মাকে ডাকাডাকি করে। কোনও শব্দ না পেয়ে মুখের ওপর থেকে বালিশ সরিয়ে দেয়। মায়ের হাত-পা ঠান্ডা ও শ্বাস বন্ধ আছে বুঝতে পেরে বাসা থেকে স্কুলে যায়। প্রিন্সিপালের মোবাইল ফোন থেকে তার বাবাকে ঘটনা জানায়।