ঢাকার রায়েরবাগের জোড়াখাম্বা এলাকার রওয়াজাতুল উলূম হাফিজিয়া নুরারী মাদ্রাসা থেকে শিশু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার মামলায় দুই শিক্ষকের মধ্যে হাফেজ মো. জাকারিয়াকে (৩৫) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। হাফেজ মো. জোবায়ের আহম্মেদকে (২০) শিশু দাবি করায় রিমান্ড শুনানি হয়নি। এ বিষয়ে শুনানির দিন রাখা হয়েছে ১৮ অগাস্ট।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম এ আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুস ছবুর এ তথ্য জানান।
এদিন শুনানি শেষে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে আসামিদের ওপর হামলা চালায় নিহতের স্বজনরা।
গত ৩ অগাস্ট দুপুরে ওই মাদ্রাসার তৃতীয় তলার বাথরুম থেকে নাঈম শেখ (১৩) নামে ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার মা নাজমা বেগম এই দুই জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর ওইদিন রাত ১০টার দিকে তাদের মাদ্রাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
৫ অগাস্ট তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কদমতলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমজাদ হোসেন। আদালত আসামিদের উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন বৃহস্পতিবার।
এদিন শুনানিকালে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। বাদীপক্ষে অ্যাডভোকেট হারুনর রশীদ খান আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। জাকারিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী ইমদাদুল আলম রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন। জোবায়েরকে শিশু দাবি করেন তার আইনজীবী। এ জন্য তার বিষয়ে শুনানি হয়নি।
জাকারিয়ার বক্তব্য শুনতে চান বিচারক। তিনি বলেন, যোহরের আজানের পর বাথরুমে যায়। আর আসে না। ডাক দিলেও বাথরুমের দরজা খোলে না। বড় ছাত্ররা মাদ্রাসায় ছিল। তারা দরজা খোলে। দেখে, জামার হাতার সঙ্গে ফাঁসি নিয়েছে।
তিনি বলেন, আমি তখন মদনপুর ছিলাম। ফোনে খবর পেয়ে মাদ্রাসায় আসি। এসে দেখি গা গরম ছিল। ডাক্তারকে কল করি। তিনি আসেন। এসে বলেন, বাচ্চা আর নেই।
এ সময় বিচারক জানতে চান, মাদ্রাসায় সিসিটিভি ফুটেজ আছে কিনা?
জাকারিয়া বলেন, আছে। তবে হার্ডডিস্ক নষ্ট। তদন্ত, পোস্টমর্টেম করলে সব বের হয়ে আসবে।
এ পর্যায়ে বিচারক বলেন, ধরে নিলাম, আন ন্যাচারালি কিছু নাই। শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন?
এর সদুত্তর না দিয়ে জাকারিয়া বলেন, মাদ্রাসার হাফেজ বলেছে, আগেও সে তিনবার পালায়ছে।
সিসিটিভি ফুটেজের হার্ডডিস্ক নষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে এর দায় এড়াতে পারবেন না, বলেন বিচারক।
নাঈম শেখের ভাইও ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতো। তাকে ডেকে নিয়ে বক্তব্য শোনেন বিচারক। কী পড়ে জানতে চাইলে নাঈমের ভাই বলে, নাজারাত।
শিক্ষকরা মারধর করতো কিনা বিচারক জানতে চাইলে বলে, ‘মারতো।’
কী দিয়ে মারতো বিচারকের প্রশ্নে শিশুটি জানায়, বেত দিয়ে।
পরে আদালত জাকারিয়ার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। আর জোবায়েরের বিষয়ে শুনানির দিন রাখেন ১৮ অগাস্ট।
আসামিদের ওপর স্বজনদের হামলা
মাদ্রাসার দুই শিক্ষককে আদালতে হাজির করা হবে জেনে সকাল থেকে নাঈমের মা-বাবা, ভাইসহ স্বজনরা আদালতের সামনে অবস্থান করেন। শুনানিকালে এজলাসে তোলা হলে সেখানে অবস্থান করেন তারা। রিমান্ড আদেশের ওপর উচ্ছ্রাস প্রকাশ করেন।
পরে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে ঢাকার সিএমএম আদালতের সামনে আসামিদের ওপর হামলা চালান নিহতের স্বজনরা। পরে দ্রুততার সঙ্গে আসামিদের হাজতখানায় সরিয়ে নেওয়া হয়।
মামলার বিবরণ থেকে জানা গেছে, নাজমা বেগমের দুই ছেলেই ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। আসামিরা বিভিন্ন কারণে নাঈমকে নির্যাতন করতো। নাঈম বিষয়টি তার মাকে জানায়। নাজমা তার ছেলেকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু আসামিরা মাদ্রাসা থেকে ছাড়পত্র দেবে না বলে জানায়। নাঈম সেখানে পড়াশোনা করতে না চাওয়ায় আসামিরা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয় এবং নির্যাতন করতে থাকে।
৩ অগাস্ট দুপুর ১টার দিকে নাঈম তার শিক্ষকদের জানিয়ে দেয়, সে মাদ্রাসায় পড়বে না। তখন তাকে মারধর করা হয়। পরে দুপুর ১টা থেকে আড়াইটার মধ্যে আসামিরা নাঈমকে শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেন নাজমা বেগম।