স্কুলছাত্র আশরাফুল নিখোঁজের জট খুললো ৩ বছর পর, মূল আসামি গ্রেফতার

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলামের নিখোঁজ ও হত্যার জট খুলেছে। তাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আশরাফুল হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে (৫৪) গ্রেফতার করেছে।

বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) দুপুরে শাহজাদপুর থানার জামিরতা বাজার এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে সিআইডি সিরাজগঞ্জ জেলা ইউনিট।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীন খানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সিআইডি জানায়, ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইলে একাধিকবার আশরাফুলকে ফোন করে বাড়ি থেকে জামিরতা বাজারে ডেকে নিয়ে যান। এরপর আশরাফুল আর বাড়ি ফেরেনি। পরদিন তার মোবাইলও বন্ধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে আশরাফুলের বাবা শাহজাদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

দীর্ঘদিন আশরাফুলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তার মা মোছা. নাছিমা খাতুন ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর তিনজনকে আসামি করে আদালতে পিটিশন মামলা করেন। পরে আদালত মামলাটির তদন্তভার সিআইডি সিরাজগঞ্জকে দেন।

সিআইডি জানায়, মামলাটি শুরুতে ক্লু-লেস শিশু অপহরণ মামলা হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছিল। পরে এসআই (নিরস্ত্র) মো. আজমল হোসেন তদন্তভার গ্রহণ করেন। সিআইডি সিরাজগঞ্জের বিশেষ পুলিশ সুপার মোনালিসা বেগমের নির্দেশনায় প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ, স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্তসহ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হয়।

তদন্তের একপর্যায়ে মামলার এজাহারনামীয় এক নম্বর আসামি রফিকুল ইসলামের ভূমিকা সামনে আসে। পরে আদালতের আদেশে মামলাটি পিটিশন মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় দায়ের করা হয়। এরপর তদন্ত আরও জোরদার করা হয়।

সিআইডি বলছে, গ্রেফতারের পর রফিকুলকে জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য দেন।

জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানান, আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অবস্থায় রফিকুল জানতে পারেন, আশরাফুল তার আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। বিষয়টি রফিকুলের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন মোবাইলে আশরাফুলকে ডেকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে যান রফিকুল। সেখানে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে কৌশলে তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে তাকে যমুনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে রফিকুল জিজ্ঞাসাবাদে জানান। পরে নদীর স্রোতে মরদেহ ভেসে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।

রফিকুল আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।

সিআইডি আরও জানায়, রফিকুলের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৩ জুন শাহজাদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। সেটির তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং বিচার শেষে তিনি সাত বছরের সাজা ভোগ করেন।

তবে আশরাফুল হত্যার রহস্য উদঘাটন হলেও এখনো তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রফিকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। যমুনা নদীর ভাটির অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহের তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন থানার রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।