ঢামেকের চিকিৎসকের ওপর হামলার নেপথ্যে কী

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের (৫৫) ওপর হামলা চালিয়েছে একদল দুর্বৃত্ত।

গুরুতর অবস্থায় ওই চিকিৎসক ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

সোমবার (১৭ আগস্ট) রাতে রাজধানীর শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেম্বার থেকে বের হয়ে অটোরিকশায় ওঠার সময় হামলার শিকার হন আসাদুর রহমান। তার মাথায়, মুখে, চোখে আঘাত করা হয়। পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চিকিৎসক বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় এখন পর্যন্ত জড়িত থাকার অভিযোগে সজীব নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পল্টন থানা পুলিশ।

এদিকে ঢামেকের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ১১ দিন আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমনের নামে’ চাঁদা চেয়ে তার কাছে বার্তা এসেছিল। দাবি করা সেই টাকা পরিশোধের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। এর দুদিন পরই হামলা চালানো হয় চিকিৎসকের ওপর।

হামলার ঘণ্টাখানেক পর একই নম্বর থেকে (যে নম্বর থেকে চাঁদা চেয়ে মেসেজ পাঠানো হয়) বার্তা আসে ‘হাউ ডু ইউ ফিল’।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চিকিৎসক আসাদুর বলেন, বার্তার নিচে লেখা ছিল ডেভিড ইমন নামে একজনের নাম। ডেভিড ইমন গত ২৭ জুলাই ভারতে পালানোর সময় যশোর সীমান্তে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে।

পুলিশ বলছে, ঘটনার তদন্ত চলছে। ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদা দাবি ও আক্রমণ চালিয়েছে কিনা সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। হামলার ওই ঘটনার পর সাংবাদিকদের অধ্যাপক আসাদুর জানান, হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে সন্দেহ তার।

তিনি বলেন, ‘গত ৬ আগস্ট বার্তা পাঠিয়ে আমার কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা চাওয়া হয়। ১৫ আগস্টের মধ্যে টাকা দিতে বলা হয়েছিল। শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্বই দিইনি। বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কোনও ভুয়া গ্রুপ হতে পারে। কিন্তু দেখা গেল, ১৫ তারিখ সময় দেওয়ার পর তারা ১৭ তারিখে এসেই হামলা করলো।

তিনি আরও বলেন, ‘চেম্বার শেষ করে সিএনজিতে ওঠার পর ৮-১০ হাত সামনে এগোনোর পর তারা পথ আটকায়। তারা দরজা খুলতে বলছিল। আমি ড্রাইভারকে মানা করেছি যে ‘দরজা খুলো না’। আমি তাদের (হামলাকারী) জিজ্ঞেস করেছি যে তোমরা কী চাও, তোমাদের সমস্যা কী? তখন একজন বলতেছে, ‘তুই অমুকের বোনের ভুল চিকিৎসা করেছিস। তুই দরজা খোল। আমি বললাম,  ‘কার বোন,  সেই রোগীটা কোথায়’। তখন তারা কিছু বলে না, শুধু বলে ‘দরজা খোল আগে’। আমার মানা না শুনে দরজা খুলে দিল ড্রাইভার। তখন তারা মাইর শুরু করলো।

ঘটনাস্থল থেকে আশেপাশের লোকজন হামলাকারীদের একজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছে। অধ্যাপক বলেন, পরে পুলিশ তাকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেছে, তখন সে রোগী সম্পর্কিত কোনও বিষয় কিছুই বলতে পারেনি। এরপর সে পুলিশকে বলছে যে, কেউ একজন তাকে বলেছে ‘এই ডাক্তার সাহেবের অনেক টাকা আছে। তার কাছে আমরা যাব, তুই আমাদের সাথে চল, তোকে একটা মোবাইল কিনে দিব’। এ জন্য সে আসছে। এগুলো সব আমার শোনা কথা। ঘটনা অন্যরকমও হতে পারে।’

আসাদুর রহমান বলেন, ‘মারধরের ঘণ্টাখানেক পরে মেসেজ পাঠাইছে ‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’। এর পরদিন মেসেজ পাঠাইছে, ‘তুমি কি আরও ঝামেলা করতে চাও?’ তারপরে মেসেজ পাঠাইছে, ‘তোমার কাছে কি আমরা মিডিয়ার লোকজন পাঠাব?’

হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেছেন এ চিকিৎসক। এজাহারে তিনি ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করেন। তবে এজাহারে ডেভিড ইমনের নাম বা হামলার পরে বার্তা পাঠানোর বিষয়টি নেই।

আসাদুর রহমানের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবার (১৯ আগস্ট) মানববন্ধন করেছে চিকিৎসকদের দুটি সংগঠন। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সোসাইটি অব অটোল্যারিংগোলজিস্ট অ্যান্ড হেড–নেক সার্জনস অব বাংলাদেশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতি যৌথভাবে এই মানববন্ধন পালন করে। হামলাকারীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বক্তারা চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করতে সরকারকে আহ্বান জানান।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জীবন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চাঁদা দাবি বা নেপথ্যে কারা আছে এসবই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের টিমগুলা কাজ করছে। এখনই আসলে বলা যাচ্ছে না যে ইস্যুটা কি চাঁদাবাজির নাকি অন্য কোনও ইস্যু। আমরা আসলে আরও লোকজন গ্রেফতার করতে পারলে তারপরে তদন্তের অন্যান্য তথ্যগুলা পেলে তখনই বলতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে চাঁদাবাজির কোনও ইস্যু আছে নাকি অন্য কিছু মোবাইলে তো মেসেজ আসছিল ‘ডেভিড ইমন’ নাকি চাদা দাবি করেছিল; সে তো জেলে আছে। তারপরও মানে অনেকে তো অনেক কিছুর নাম করে করতে পারে। তবে প্রকৃতপক্ষেই এটা চাঁদাবাজির ঘটনা কিনা? ঘটে থাকলে এটা ডেভিড ইমন করেছে কিনা বা অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা- এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। যারাই জড়িত থাকুক না কেন, আইনের আওতায় আসতে হবে।’

হামলার ঘটনায় গ্রেফতার যুবকের সাথে ডেভিড ইমনের কোনও যোগসূত্র পাওয়া গেল কিনা?- এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখনই এটা বলা যাচ্ছেনা। তবে এখন পর্যন্ত মানে; চাঁদাবাজির পক্ষে-বিপক্ষে কোনটাই পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘চাঁদা চাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকের হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হয়েছে। এখন তো বিভিন্ন চক্র থাকে; যারা নানাভাবে মেসেজ পাঠায়। তবে যেহেতু চিকিৎসকের ওপর আঘাত হয়েছে; আমরা তদন্ত করছি। এক্ষেত্রে নানা যেসব ইস্যু আসবে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজির মধ্য দিয়ে কুখ্যাতি পাওয়া ইমন গত ২৭ জুলাই রাতে ভারতে যাওয়ার চেষ্টার সময় যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ইমন বিদেশে পালিয়ে থাকা চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী বলে জানিয়েছে পুলিশ।