ধানমন্ডিতে অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যু: তিন মাসেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পায়নি পুলিশ

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যুর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই। নিহতের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে সম্পত্তির বিরোধকে কেন্দ্র করে অর্ণবকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্যে অর্ণব আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।

পরিবারের অভিযোগ, মামলার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সাক্ষীকেই এখন পর্যন্ত পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যে তিন দফা সময় নিয়েছেন।

অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, তিন মাস হয়ে গেলো, কিন্তু আমরা এখনো ন্যায়বিচারের কোনো অগ্রগতি দেখছি না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি তারা সবাই জামিনে বাইরে, অথচ মামলার সাক্ষীদের একজনকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।

জানা গেছে, অর্ণবের মৃত্যু নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মৃত্যুর পর একটি হত্যা মামলাও করে পরিবার। সেই মামলা তদন্ত করছে পুলিশ। কিন্তু স্বজনরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, এই মৃত্যুর পেছনে শতকোটি টাকার সম্পদের বিরোধ রয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া শতকোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিতে তার চাচা ও ফুপুরা পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ নিহতের মা হালিমা খাতুনের।

নিহত অর্ণবের পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর দু’দিন আগেও অর্ণব তার খালা ও মাকে জানিয়েছেন, তাকে মানসিক নির্যাতন করছেন তার চাচা। তার চাচা ওসমান গণি ও তার স্ত্রী অর্ণবের বাসায় এসে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে আখ্যা দেন। তারা তাকে তাদের পরিচিত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে অর্ণব অস্বীকৃতি জানান। পরে তারা অর্ণবকে জোর করে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে অর্ণব কৌশলে সিগারেট কেনার নাম করে ঘরে থেকে বেরিয়ে খালা শাহনাজ বেগমের বাসায় চলে যান, সেখানে তাদের সবকিছু খুলে বলেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাবার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলে অর্ণব পৈতৃক শতকোটি টাকার সম্পদ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেওয়া হয়। পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল।

গত ২ মে দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অর্ণবের (৩৪) রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ভবনটির লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানায় পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। তবে গত ২১ মে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন অর্ণবের ৩ চাচা-ফুপুসহ ১২ জনকে আসামি করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেখানে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলার অন্যতম আসামিরা হলেন অর্ণবের চাচা ওসমান গণি ভূঞা (৬৮) ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া (৭০), আরেক চাচা জাহেদ ভূঞা (৭২) ও তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম রেনু (৬২)।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকেই তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। অভিযুক্তরা যৌথভাবে এই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরে বারবার বাধা দিয়ে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও নানাভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই অভিযুক্তরা অর্ণবকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়।