রাজধানীর ধানমন্ডিতে গাড়ি আটকে দুই চিকিৎসককে হুমকি ও হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগ (ডিবি)। গ্রেফতার দুজন হলেন, সানি সাহা (৩৮) ও ফাতিন ইসরাক লাবিব (২০)। ডিবির দাবি, সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই চিকিৎসককে টার্গেট করা হয়েছিল।
রবিবার (২৩ আগস্ট) সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম।
ডিবি-ওয়ারী বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডি থানাধীন ৪ নম্বর রোডে পাঁচজন দুষ্কৃতকারী গাড়ি প্রতিরোধ করে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল হাসপাতালের ইএনটি মেডিসিনের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হককে হুমকি দেয়।
এরপর গত ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগর এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে নিজ বাসায় ফেরার জন্য বের হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমান। পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে পাকা রাস্তায় তিনি একটি সিএনজিতে ওঠার সময় জীবন ওরফে আদিলসহ কয়েকজন তার সিএনজির গতিরোধ করে।
গতিরোধের কারণ জানতে চাইলে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে চিকিৎসককে সিএনজি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জীবন ওরফে আদিল চিকিৎসকের ডান চোখে গুরুতর জখম করে। অন্য আসামিরা তার মাথা, দুই চোখের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এ সময় তারা চিকিৎসককে ভয়ভীতি ও হুমকিও দেয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন বিষয়টি পল্টন মডেল থানা পুলিশকে জানালে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবন ওরফে আদিলকে আটক করে। অন্যরা কৌশলে পালিয়ে যায়। পরে আহত চিকিৎসক চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।
এ ঘটনায় অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় জীবন ওরফে আদিলসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার কিছুদিন আগে একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে চিকিৎসকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে ফোন করে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
ঘটনার পর হামলার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি ও তদন্ত শুরু করে ডিবি। তদন্তের ধারাবাহিকতায় রবিবার রাত ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার শনির আখড়া গোয়ালপাড়া কদমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে সানি সাহাকে এবং রাত আড়াইটার দিকে খিলক্ষেত থানাধীন নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেফতার করা হয়।
ডিবি জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সানি সাহা জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় সিঙ্গাপুরে জেএনএস ইন্টেরিয়র ডিজাইনার প্রজেক্ট কোম্পানিতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় ২০২৩ সালে জান্নাত আলমগীর হোসেন নামে একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে আলমগীর হোসেন তাকে মানি লন্ডারিং প্রক্রিয়ায় টাকা আয়ের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের পর সে বিভিন্ন সময়ে মানি লন্ডারিং ব্যবসায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৮ বা ৯ আগস্ট বাংলাদেশে আসার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জান্নাত আলমগীর হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, তখন জান্নাত আলমগীর হোসেন সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, গতিবিধি ও আর্থিক বিষয়াদি সম্পর্কে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সানি সাহাকে দেন। একই সঙ্গে অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হক ও অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমানকে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের জন্য সানিকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়।
ওই অ্যাসাইনমেন্ট পাওয়ার পর সানি সাহা হামলায় অংশগ্রহণকারী সদস্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় ফাতিন ইসরাক লাবিবকে।
জিজ্ঞাসাবাদে ফাতিন ইসরাক লাবিব জানিয়েছে, ঘটনার আনুমানিক আড়াই মাস আগে ফুড ডেলিভারির মাধ্যমে অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী সানি সাহার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয়ের কয়েক দিন পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়। পরে ফাতিন অধ্যাপক মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য আবু বকর (১৮), রাতুল (১৯), ইবান (২২), জীবন (২১) ও সাব্বির (১৮)-কে এক লাখ টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গে কাজ করতে বলে। পরে তারা সবাই মিলে হামলার ঘটনা ঘটায়।
এ ঘটনায় ইবান (২২) ও জীবন (২১) গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে রয়েছে।
গ্রেফতারকৃত সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিবের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।