চাঁদাবাজিতে ছাড় নয়, কঠোর অবস্থানে সরকার

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হচ্ছে সরকার। চলছে বিশেষ অভিযান। তৈরি হচ্ছে তালিকা। গ্রেফতারও হচ্ছে শত শত চাঁদাবাজ। এরইমধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনায় না নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘‘এবার চাঁদাবাজ ধরতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই অবস্থানের সঙ্গে একমত পুলিশ সদর দফতরও। তাদের বক্তব্য, চাঁদাবাজির অভিযোগে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজি হলেও ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ পেলে পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত হবে। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে— গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে অনেকেই আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে।’’

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশ ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং এরই মধ্যে বেশ কিছু চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’’

তিনি বলেন, “সমস্যা হচ্ছে, অনেকেই জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। সরকারের যে সিদ্ধান্ত, পুলিশ সদর দফতর সেটিই বাস্তবায়ন করে।”

ভুক্তভোগীদের ভয় না পেয়ে অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীরা যেন সাহস করে অভিযোগ করেন। এই ধরনের ঘটনায় কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না—পুলিশ সদর দফতরের অবস্থান সেটাই।”

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘‘কেউ জামিনে বেরিয়ে নিজেকে সংশোধন করলে সেটি ভালো। কিন্তু পুনরায় একই অপরাধে জড়ালে— তার বিরুদ্ধে আবার আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা

 শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানকে দেখতে গিয়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশসহ দেশের মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে চাঁদাবাজ, চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আজকেই নির্দেশনা দিয়েছি, তাদের অতি শিগগির হেফাজতে নিতে হবে, আইনের আওতায় আনতে হবে।”

নির্দেশ বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

চিকিৎসকের কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি, এরপর হামলা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা।

অধ্যাপক আসাদুর রহমানের অভিযোগ, হামলার কয়েক দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়। বার্তায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমনের’ নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। টাকা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি টাকা দেননি।

যে কারণে ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগরে নিজের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর তার ওপর হামলা হয়। মাথা, মুখ ও চোখে গুরুতর আঘাত পান তিনি। হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর একই নম্বর থেকে আবার বার্তা পাঠানো হয়—‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও?’ ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা হয়েছে। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের পর ফারহান শাহরিয়ার ওরফে ইভানকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত সাতজনের মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতেও অভিযান চলছে।

হাসপাতালে চাঁদা দাবি, সাতজন গ্রেফতার

হাসপাতালকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এপ্রিলে রাজধানীর শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পরে র‍্যাব-২, র‍্যাব-৪ ও র‍্যাব-৬ যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে প্রধান অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে আদালত সাতজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মতিঝিলেও ঘটে আলোচিত একটি ঘটনা। দক্ষিণ কমলাপুরের কোরবানির পশুর হাটের এক ইজারাদারের কাছে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তার অফিস লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। তদন্তের পর জুলাইয়ে কথিত শ্যুটার তানিম রেজা ওরফে বাপ্পিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, সাত রাউন্ড গুলিসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

ঢাকার বাইরেও তালিকা ধরে অভিযান

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তালিকাভিত্তিক অভিযান শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই। খুলনা মহানগর পুলিশ ৮৩৪ জন অপরাধীর একটি তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করেছে। এর মধ্যে ৬৯ জনকে চাঁদাবাজ, ১৮১ জনকে সন্ত্রাসী এবং ৫৮৪ জনকে মাদক বিক্রেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশ ও সদ্য বিলুপ্ত র‍্যাব, যা বর্তমানে এসআরবিসহ বিভিন্ন সংস্থা এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।

সংসদেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি দমনে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান চালানো হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধী শনাক্ত করা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন থানায় বিশেষ স্কোয়াডও কাজ করছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেও তদন্ত

চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশের কারও যোগসাজশ রয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘চলমান বিশেষ অভিযানে পুলিশের সরাসরি চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ততার আলাদা কোনও তথ্য তার কাছে নেই। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়া বা অন্য ধরনের অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

তিনি বলেন, “পুলিশের কারও বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আসে না—তা নয়। এ ধরনের অভিযোগ মাঝে মধ্যে আসে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হয় এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ চাঁদাবাজের পাশাপাশি পুলিশের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সেটি তদন্তের বাইরে থাকবে না।’’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তবে এত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও চাঁদাবাজি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে— এমন দাবি করার সুযোগ নেই। চাঁদাবাজির অভিযোগে কাউকে ছাড় নয়। রাজনৈতিক পরিচয়ও ঢাল হবে না। আর দায়িত্বে থেকেও ব্যবস্থা না নিলে জবাবদিহি করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।

পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজের তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাদের অনেকের রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। আরেকটি পুলিশি তালিকায় ঢাকায় চাঁদাবাজিতে সক্রিয় প্রায় ১৪৮ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ শুধু গ্রেফতার বাড়ানো নয়। মূল হোতাদের ধরতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব ভাঙতে হবে। জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে ফিরে আসা ঠেকাতে নজরদারি বাড়াতে হবে। পুলিশের কেউ যোগসাজশ করলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’’