‘ভুল দায়মুক্তিতে’ পদোন্নতি, বেবিচকের ৩ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে মন্ত্রণালয়

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। তারা হলেন, আমিনুল হাসিব, মওদুদ আহমেদ ও নুরুদ্দীন। এদের মধ্যে আমিনুল হাসিব ও মওদুদ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা থাকা সত্ত্বেও তাদের ‘মামলা নেই’ উল্লেখ করে দায়মুক্তির চিঠি দেওয়া হয়। পরে ওই চিঠির ভিত্তিতে আমিনুল হাসিবকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দুদক ওই চিঠিতে ‘ভুল তথ্য’ থাকার কথা জানিয়ে তা প্রত্যাহার করে।

অন্যদিকে প্রকৌশলী নুরুদ্দীনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনি একই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার (পিই) পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য প্রশাসন অতিরিক্ত সচিব এসএম লাবলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মওদুদ আহমেদের ব্যাপারে দুদকের দায়মুক্তি ও পরে তা প্রত্যাহারের বিষয়টি তিনি জানেন। দায়মুক্তি প্রত্যাহারের চিঠি দুদক মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে। এর একটি কপি বেবিচকও পেয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ বা চিঠি এখনো হাতে পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয় কী জানায়, তার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যখন জানতে চেয়েছিল, তখন দুদক থেকে দায়মুক্তির চিঠি আসে। এরপর তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, এখন যেহেতু দুদক বিষয়টি সংশোধন করে দায়মুক্তি প্রত্যাহার করেছে, তাই মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেবে, তার আলোকে তারা কাজ করবেন।

নুরুদ্দীনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রকৌশলী সংকট রয়েছে। সেজন্যই তাকে রাখা হয়েছে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নুরুদ্দীনের ব্যাপারেও দুদক তদন্ত করছে। দুদক কোনো ফাইন্ডিংস দিলে তার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দায়মুক্তি ও পরে প্রত্যাহার

জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একাধিক বিমানবন্দর প্রকল্পে ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুদক চারটি মামলা করে।

দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় আমিনুল হাসিব ৯ নম্বর আসামি। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় মওদুদ ৯ নম্বর আসামি। দুটি মামলার তদন্তই দুদকের মানিলন্ডারিং শাখায় চলছে।

চলতি বছর ১১ মার্চ সিএএবি, সিভিল সার্কেল প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিবকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। একই চিঠিতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মইদুর রহমান মো. মওদুদকেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বরাবর লেখা দুদক পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘এ কার্যালয়ে (দুদক) প্রাপ্ত তথ্যমতে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিম্নবর্ণিত মোট দুজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে কোনো মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন নেই।’

কর্মকর্তারা হলেন, সিভিল সার্কেল প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মইদুর রহমান মো. মওদুদ। এরপর আমিনুল হাসিব নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

পরবর্তী সময়ে চিঠিতে ভুল তথ্য থাকার কথা স্বীকার করেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একই তারিখ ও স্মারকের আগের চিঠির স্থলে প্রকৃত তথ্য দিয়ে একটি প্রতিস্থাপন চিঠি পাঠানো হবে। নতুন চিঠিতে কোন কর্মকর্তা কোন মামলার আসামি, তা উল্লেখ থাকবে।

দুদক সচিব জানান, এটি ভুলক্রমে হয়েছে নাকি সচেতনভাবে করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা তদন্তাধীন থাকার তথ্য বেবিচককেও জানানো হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বলেন, একই তারিখ ও স্মারকে প্রতিস্থাপন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। নতুন চিঠিতেও আগের স্মারক নম্বর ও ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখ রাখা হয়েছে। তবে পরিচালক মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানের সইয়ের নিচে ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রয়েছে।

প্রতিস্থাপন করা চিঠিতে বলা হয়েছে, আমিনুল হাসিব দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এর ৮৫ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি করা মামলাটি তদন্তাধীন। মওদুদ একই কার্যালয়ের ৮৪ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি। ওই মামলাটিও ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি করা হয়। সেটির তদন্তও চলছে।

প্রথম চিঠিতে সই করা পরিচালক মোহাম্মাদ নাজমুল হাসানই প্রতিস্থাপন চিঠিতে সই করেছেন।

যে কারণে আলোচিত প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব

২০১৯ সালের নভেম্বরে কক্সবাজার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে আমিনুল হাসিবকে বরখাস্ত করে বেবিচক। পরে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খানের সুপারিশে ২০২১ সালে আবার তার চাকরি নিয়মিত হয়। এরপর তারই সুপারিশে ২০২৩ সালে আমিনুল হাসিবকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে চলতি দায়িত্ব প্রদানের সুপারিশ করা হয়। বেবিচক তাকে চলতি দায়িত্বও দেয়। দীর্ঘ চার বছর তিনি চলতি দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু দুদক থেকে ‘মামলা নেই’—এমন চিঠি পাওয়ার পরপরই তাকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, দুদক থেকে মামলা না থাকার এনওসি ও পদোন্নতি নিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করেছেন তিনি।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ২১ থেকে ২৮ ডিসেম্বর তিনি তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। সফরের বিষয়ে তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি। বিদেশ সফরের সময় তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে পরে কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দেশে ফেরেন। সে সময় এ বিষয় নিয়ে বেবিচকে তোলপাড় হলেও অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তবে এ বিষয়ে আমিনুল হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুদক যদি ভুল করে তাহলে আমার করার কী আছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু মামলা থাকলেই যে প্রমোশন হবে না, এমনটা নয়। মামলার চার্জশিট এখনো হয়নি। চার্জশিট হলে পদোন্নতিতে সমস্যা হয় বা না হয়। আমার তো চার্জশিট হয়নি।’ এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

নিয়ম-নীতি ভেঙে বছরের পর দ্বৈত পদে প্রকৌশলী

নিয়মানুযায়ী কোনো কর্মকর্তা রাজস্ব খাতে একই পদে কিংবা একই দফতরে তিন বছরের বেশি সময় থাকতে পারেন না। অথচ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দীন চৌধুরী ওই নিয়ম উপেক্ষা করে সাড়ে ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই দায়িত্বে বহাল আছেন। তাও অতিরিক্ত দায়িত্বে।

সূত্র জানায়, নুরউদ্দীন পূর্ণকালীন সময়ের জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারিত (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু একই সঙ্গে প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার (পিই) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারের (পিই) দায়িত্বে তিনি সাড়ে ৫ বছরের অধিক সময় রয়েছেন। অথচ সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী একাধারে এতদিন একই পদে বা দায়িত্বে থাকা আইনসঙ্গত নয়।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, ‘যদি কোনো কর্মকর্তা পূর্ণকালীন কোনো পদে নিযুক্ত হন, তবে তিনি অন্য কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। বিশেষ করে একই প্রকল্পে একাধিক দায়িত্ব গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে বিধিবহির্ভূত।’ কিন্তু বাস্তবে নুরউদ্দীন একই প্রকল্পে পিডি ও পিই, উভয় দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করছেন। এ বিষয়ে প্রকৌশলী নুরুদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দুদকের এমন ঘটনায় তারা বিব্রত। যেহেতু বিষয়টি ভুল স্বীকার করে দুদক চিঠি দিয়েছে, সেহেতু বিষয়টি তারাও আমলে নিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আমিনুল হাসিব তার পদোন্নতির জন্য কোনো প্রকার যোগসাজশ করে দুদক থেকে এনওসি নিয়েছেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একদিকে দুদক তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ও আমিনুল হাসিবের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে।

তিনি বলেন, বেবিচকের প্রকৌশল শাখার যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান করছে কিংবা মামলা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মধ্যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না রাখা এবং দুদকের চূড়ান্ত রায় হলে এককালীন বরখাস্ত করার বিষয় রয়েছে।