রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় গুলির ঘটনায় শ্যুটারকে চিহ্নিত করতে অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাদক কারবারে বাঁধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এবং আধিপত্য ধরে রাখতে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তবে কে শ্যুটার ছিল তা খুঁজতে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, র্যাব ও পিবিআই কাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী সজল ওরফে অটো সজল গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে থাকলেও তার অনুসারীরা এখনও এলাকায় সক্রিয়। তারা দাপটের সঙ্গে মাদক কারবার করে চলেছে। স্থানীয়রা এতে বাধা দেওয়ায় তারা এলোপাতাড়ি গুলি করে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। আর তাদের ছোঁড়া গুলিতে আহত হন কয়েকজন
গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনা যে মাদক কারবারীরা করেছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু গুলিটা করলোটা কে, এই লোককে আমরা খুঁজছি।
তিনি বলেন, অটো সজলসহ অনেক অনুসারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা এখন জেলহাজতে রয়েছে। তাদের দু’একজন অনুসারী এখনও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে এটা সত্য।
ওসি আরও বলেন, এখনও এ ঘটনায় মামলা হয়নি। মামলা হলে ভুক্তভোগীরা কারও নাম দেয় কি না সেটাও দেখছি। তবে আমাদের তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। পাশাপাশি র্যাব, ডিবি ও পিবিআই কাজ করছে। আমরা শ্যুটারকে চিহ্নিত করতে সিসিটিভির ফুটেজ দেখছি। পাশাপাশি লোকাল সোর্সদের সঙ্গেও কথা বলছি। তাদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তবে যেই বা যারাই গুলির ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গেন্ডারিয়াসহ আশপাশের পুরো এলাকার মাদক, চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ ছিল অটো সজলের হাতে। গত জুনে অটো সজল গ্রেফতার হওয়ার পরও তার সহযোগীদের দাপট কমেনি। সম্প্রতি তিন মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ওই গ্রেফতারে স্থানীয় লোকজন সহায়তা করে। আর এ কারণে এই গ্রুপটা ক্ষিপ্ত হয়। যার কারণে রবিবার রাতে তারা সংঘব্ধ হয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এ রকম ঘটনা ঘটায়।
ইয়াসিন নামের স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, তাদের এতটাই দাপট যে, তাদের বিষয়ে কিছু বলতে পারে না এলাকার লোকজন। তারা প্রকাশ্যই মাদক, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে তারা মারধর করে।
তিনি বলেন, রবিবার সন্ধ্যায় তারা মূলত এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে এটাই জানান দিয়েছে যে, কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই হয় গুলি করবে, নয়তো কোপাবে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক ও ভয়ভীতি বিরাজ করছে।
কে এই অটো সজল
‘অটো সজল’ (মূল নাম ইসমাইল হোসেন ওরফে সজল) হলেন, পুরান ঢাকার ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া এলাকার এক শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক সম্রাট এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাকারবারি। পরিবহনের হেল্পার পরিচয়ের আড়ালে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে একটি বিশাল অপরাধ সিন্ডিকেট বা কিশোর গ্যাং পরিচালনা করে আসছিলেন।
তিনি মূলত পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ এবং হেরোইন ও ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অন্যান্য অপরাধে ১১টি মামলা রয়েছে।
কিশোর গ্যাং পরিচালনা
পুরান ঢাকার যাত্রাবাড়ী, গেন্ডারিয়া, বংশাল ও চকবাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির জন্য তার নিজস্ব একটি গ্যাং রয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে কিশোর গ্যাং ‘অটো সজল’ গ্রুপ নামে পরিচিত।
কর্মকর্তাকে গুলি ও গ্রেফতার
২০২৬ সালের ২ মার্চ ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন পরিদর্শককে গুলি করার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার তদন্তে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে অটো সজলের নাম সামনে আসে।
পরে ২০২৬ সালের ১৯ জুন ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ সায়েদাবাদ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার
গ্রেফতারের পর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগে তার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে দুটি টরাস ব্র্যান্ডের পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিন, ৭৭ রাউন্ড গুলি, বিপুল পরিমাণ হেরোইন এবং নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রও ছিল।
তার অনুসারীরা এখনও পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া ও মুন্সিরটেক এলাকায় মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং আধিপত্য বিস্তারে সাধারণ মানুষের ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র হামলা ও তাণ্ডব চালিয়ে আসছে।
প্রসঙ্গত, রবিবার সন্ধ্যা রাজধানীর গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগের মুন্সিরটেক এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। আহতরা হলেন—হোটেল কর্মচারী মো. সিয়াম (২২), চা দোকানি আলমগীর হোসেন (৩২) ও গৃহিণী আশা আক্তার (২৮)।
আহত সিয়াম জানান, তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করেন। সন্ধ্যায় গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেকে তার ফুফার চায়ের দোকানে এসেছিলেন। এ সময় হঠাৎ সড়কে মারামারি ও গুলাগুলি শুরু হলে তিনি দোকানের ভেতর থেকে শাটার বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তখনই একটি গুলি এসে তার ডান কাঁধে লাগে।
আলমগীরের স্ত্রী জান্নাতি আক্তার জানান, তার স্বামীও ওই এলাকায় চায়ের দোকান করেন। সন্ধ্যায় দোকানের সামনে মারামারি ও গুলাগুলি শুরু হলে আলমগীর দোকানের ভেতরেই ছিলেন। এ সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
অন্যদিকে, আহত আশা আক্তার জানান, তিনি ওই এলাকাতেই থাকেন। সন্ধ্যায় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মারামারির মধ্যে পড়ে যান। এ সময় তার ডান পায়ের ঊরুতে গুলি লাগে। তবে কারা গুলি চালাচ্ছিল, তা তিনি জানেন না।