চলতি বছরের জুলাই মাসের তুলনায় আগস্ট মাসে দেশে হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। এছাড়া ওই মাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণও ৭২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করে সোমবার (৩১ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে এমএসএফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসের তুলনায় দেশে আগস্টে মাসে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ৩০৬টি থেকে বেড়ে ৩২৭টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে ২১টি বা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নারী ও শিশু হত্যা এক মাসে ৫২টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে দাড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে হত্যা বেড়েছে ৩৯টি। যা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
আগস্ট মাসে জুলাইয়ের তুলনায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ৭২ শতাংশ বেড়েছে উল্লেখ করে এমএসএফ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যা ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। আত্মহত্যা ৩৯ শতাংশ, অপহরণ-নিখোঁজ ৮ শতাংশ, বেআইনি সালিশ ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। আর মাদক মামলায় আটক বেড়েছে ১২৯ শতাংশ।
আগস্টে অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত ঘটনায় একজন নিহত, একজন আহত এবং চার জন আটক হওয়ার তথ্য দিয়ে এসএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় একজন শিক্ষক নিহত হন এবং একজন আহত হন। আটক চার জনের মধ্যে নেত্রকোনা, যশোর, রংপুর ও ঢাকার একজন করে রয়েছেন।
সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাইবান্ধায় ধর্ষণের অভিযোগের একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ৭ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নোয়াখালীতে ১১ বছরের শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রাম্য সালিশে ৫০ বেত্রাঘাত ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এছাড়া শরীয়তপুরে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় সালিশে ১ লাখ টাকায় মীমাংসা করার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টে ৩টি জীবিত নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করার তথ্য দিয়েছে এমএসএফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত অভিভাবক বা দায়ীদের শনাক্ত করতে কার্যকর তদন্ত এবং আইনের আওতায় আনার ঘটনা খুবই বিরল।
উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা
এসএমএফ বলছে, আগস্ট মাসে বিশেষভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা জুলাইয়ের ৯৫ জন থেকে আগস্টে ২৬৭ জনে উন্নীত হয়েছে।
যদিও নিহতের সংখ্যা ৭ থেকে ৫-এ কমেছে, আহতের ব্যাপক বৃদ্ধি রাজনৈতিক সংঘাতের বিস্তার ও তীব্রতার বিষয় আতংক জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে এমএসএফ মনে করে। বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পতন-পরবর্তী বিভিন্ন মামলার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সরকার পতন-পরবর্তী মামলায় আসামির সংখ্যা জুলাইয়ের ৬০০ থেকে আগস্টে ২৪০ জনে কমলেও গ্রেফতার আসামির সংখ্যা ১২৬ থেকে বেড়ে ২০৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের পরিসংখ্যান আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, গ্রেফতারের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইনের বৈষম্যমূলক প্রয়োগ এবং ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ার অধিকার যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না— সে বিষয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেফতার ৩ থেকে ৪ জনে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া বিশেষ অভিযানে গ্রেফতারের সংখ্যাও জুলাইয়ের ৫ হাজার ১৯৬ থেকে আগস্টে ৫ হাজার ৬১৮ জনে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনিটরিং অনুযায়ী এসব গ্রেফতারের বড় অংশ মাদক-সংশ্লিষ্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি এত বিপুল সংখ্যক গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি, গ্রেফতারের যথাযথতা, আটক ব্যক্তিদের অধিকার, নির্যাতন থেকে সুরক্ষা এবং নির্বিচার বা অতিরিক্ত গ্রেফতারের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু জুলাইয়ের ২ জন থেকে আগস্টে ১ জনে এবং কারা হেফাজতে মৃত্যু ৯ জন থেকে ৫ জনে কমেছে। এটি সংখ্যাগতভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও দুই মাসের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। বিশেষ করে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিকিৎসা সুবিধা, বন্দিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা, কারাগারের পরিবেশ, জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কার্যকর ও স্বাধীন অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা আগস্টে জুলাইয়ের ৩৬ জন থেকে ৩৭ জনে হয়েছে। অধিকাংশ সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার এবং আরেকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলার পাশাপাশি গ্রেফতার, মামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির বিষয়গুলো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
একই সময়ে ডিজিটাল বা সাইবার-সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারের সংখ্যা কমেছে; তবে অনলাইন বক্তব্যের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার আগস্ট মাসে একটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। জুলাইয়ের ৫৬টির তুলনায় আগস্টে ৭১টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
এসব মৃতদেহের মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ, ১৪ জন নারী এবং ২ জনের লিঙ্গ ও বয়স শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ লাশ নদী, ডোবা, সড়ক, রেললাইন, সেতুর নিচে, ফসলি জমি ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিছু মৃতদেহ গলা কাটা, বস্তাবন্দি, হাত-পা বাঁধা বা রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়ার তথ্যও রয়েছে।
অজ্ঞাতনামা মরদেহের প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ, পরিচয় শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত, তদন্তের অগ্রগতি এবং পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। তবে এসব ঘটনাকে যথাযথ তদন্ত ছাড়া সরাসরি হত্যাকাণ্ড, গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করে এসএমএফ।
সীমান্ত পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে সীমান্তে গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা, বিএসএফের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক, মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা এবং ভারতীয় সীমান্ত থেকে পুশ-ইন ও পুশ-ইনের চেষ্টার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও ভারতীয় সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা জুলাইয়ের ১০০ থেকে আগস্টে ১৫-তে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবন, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে রয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে আগস্ট মাসে উল্লেখযোগ্য অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাইয়ের ৮টির তুলনায় আগস্টে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মোট ঘটনা ২৬টি হয়েছে।
এছাড়া ফরিদপুর ও চট্টগ্রামে প্রতিমা ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলা, প্রাণহানি এবং হুমকির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। কুমিল্লা লালমাই পাহাড়ে কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণ, খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে; পরিবার ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ করেছে, যা যথাযথ তদন্তের দাবি রাখে। এসব ঘটনা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সমঅধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
সামগ্রিকভাবে জুলাই-আগস্ট মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এসএমএফ দেখতে পেয়েছে, হেফাজতে মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যু, গোলাগুলিতে আহত, সাইবার মামলা ও সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টায়— হ্রাস হলেও তা সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি নির্দেশ করে না। বরং মব সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের ব্যাপক বৃদ্ধি, সংখ্যালঘু নির্যাতন, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার এবং বিশেষ অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে এমএসএফ মনে করে, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ, মব বিচার প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, নির্বিচার গ্রেফতার প্রতিরোধ, হেফাজত ও কারাগারে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা, সীমান্তে নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা এবং সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জরুরি। একই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা লাশসহ সকল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এমএসএফ মনে করে, মানবাধিকার পরিস্থিতির ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ মনিটরিং, তথ্যের যথাযথ যাচাই, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।