তনু হত্যা: দুই জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। তারা হলেন, সাবেক সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামান (৪৮) ও সাবেক সৈনিক মো. শাহীন আলম (৩৭)।

তনু হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অনুরোধে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি-ঢাকা) মাধ্যমে এই রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে এনসিবির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

পুলিশের ধারণা, জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলম বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। রেড নোটিশের বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানান।

তনু হত্যা মামলার তদন্তের একপর্যায়ে সাবেক তিন সেনাসদস্য সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহীন আলমের ডিএনএ প্রোফাইল ক্রসম্যাচের (মেলানোর) জন্য চলতি বছরের ৬ এপ্রিল আদালতের অনুমতি চান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম। আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেন।

এরপর গত জুনে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার একটি আদালত জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের অংশ হিসেবে জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলমের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। তবে দুজনই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলছেন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

আদালতের আদেশের পর পিবিআই এনসিবি-ঢাকায় একটি অনুরোধ পাঠায় এবং ওই দুজনকে শনাক্ত করতে ইন্টারপোলের সহায়তা চায়। বাংলাদেশের জমা দেওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ইন্টারপোল দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক রেড নোটিশ জারি করে।

তনু হত্যাকাণ্ডের সময় জাহিদুজ্জামান ও শাহীন আলম দুজনই কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের গাড়ঘাটা এলাকার জাহিদুজ্জামান কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ প্রকৌশলী ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। আর কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের শাহীন আলম সে সময় ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান।

মামলার আরেক সন্দেহভাজন সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ৮ আগস্ট ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পিবিআই। এর আগে হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর ৪ আগস্ট কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। পরে রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ওই জামিন ৯ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিত করেন। একই সঙ্গে হাফিজুর রহমানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন আদালত।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করায় তাকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৫-এর বিচারক তৈয়ব উদ্দিন তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসের অদূরে একটি জঙ্গল থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। ওই রাতেই সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস সংলগ্ন ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পরদিন তনুর বাবা ইয়ার আহম্মেদ কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। দীর্ঘ সময় সিআইডি এই মামলার তদন্ত করলেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। পরে ২০২০ সালে মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হয়। পুলিশ সদরের নির্দেশে ওই বছরের অক্টোবরে পিবিআই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয়।