উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বদলির এক মাস না হতেই দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলাসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন পাসপোর্ট অধিদফতরের আলোচিত উপ-পরিচালক রোজী খন্দকার। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সেই অফিসে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এমন ঘটনায় পাসপোর্ট অফিসে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। যে অফিসে সরকারি এই কর্মকর্তা কাজ করেছেন, সেখানেই কোনও না কোনও ঝামেলা লেগেছে।
জানা গেছে, অধিদফতরের আপত্তির পর প্রভাব খাটিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ আগস্ট বদলির আদেশ নিয়ে আসেন রোজী খন্দকার। তার যোগদানের পরপরই উত্তরা অফিসকেন্দ্রিক দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে গড়ে তোলেন বিশেষ সখ্যতা। বিষয়টি আলোচনায় আসতে অভিযান পরিচালনা করে দুদক। আর অভিযানের খবর ধামাচাপা দেওয়ারও চেষ্টা করেন তিনি।
রোজীর ফোনে সাড়া দেননি মহাপরিচালক, পরে শোকজ
সহকারী পরিচালক, উপপরিচালকসহ তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা নতুন যোগদান করলে নিয়ম অনুযায়ী মহাপরিচালককে অবহিত করতে হয়। কিন্তু রোজী খন্দকার উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলি হয়ে এসে যোগদান করলেও গত ১৫ দিনেও তিনি মহাপরিচালককে অবহিত করেননি। বুধবার যখন তার অফিসে দুদক অভিযান পরিচালনা করে, সেই মুহূর্তেও তিনি অধিদফতরকে নিজে থেকে জানাননি। গণমাধ্যমের খবর দেখে এক কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে ওই কর্মকর্তা গণমাধ্যমের রেফারেন্স দিলে তিনি স্বীকার করেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি এ ঘটনায় করণীয় কী তা জানতে মহাপরিচালককে ফোন দেন। এমন অবস্থায় মহাপরিচালক তার ফোনে সাড়া দেননি। পরে তাকে পুরো ঘটনা নিয়ে শোকজ করা হয়।
যে কারণে দুদকের অভিযান
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ অভিযানের তথ্য জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমরা উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালিয়েছে। আমরা অন্যান্য পাসপোর্ট অফিসেও পর্যায়ক্রমে অভিযান চালাবো।
দুদক সূত্রে জানা যায়, পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ গ্রহীতাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা, নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ঘুষের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্টের কাজ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগও পেয়েছে দুদক।
অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্টের আবেদন, তথ্য সংশোধন, ছবি ও বায়োমেট্রিক গ্রহণসহ বিভিন্ন ধাপে গ্রহীতাদের নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া এবং টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
রোজী খন্দকারকে নিয়ে অধিদফতরের তদন্ত প্রতিবেদন
দুদক সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর রোজী খন্দকার বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস, রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে তার অফিসকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি অফিস প্রধানের কক্ষে প্রবেশ করে হট্টগোল করেন। এমনকি মারতে যান। এ ঘটনায় মানববন্ধনও হয়। অফিসে জনসাধারণের চাপের মুখে তিনি এক পর্যায়ে মহাপরিচালককে ফোন করতে চেষ্টা করলে (আমি একজন মেজর জেনারেলকে ফোন করছি বলে সবাইকে ধমক দেন) উপস্থিত ব্যক্তিরা আরও বেশি উত্তেজিত হন এবং একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদ প্রতিবেদনে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালের মাধ্যমে কাজ দ্রুত করার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। ঘটনাটির প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণে অধিদফতর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের আওতায় আনে।
দুদক সূত্রে আরও জানা যায়, ওই ঘটনার পর অধিদফতরের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে ২০২৫ সালের ১০ এপিল অধিদফতরের পক্ষ থেকে রোজী খন্দকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করতে বলা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে পাসপোর্ট সেবা প্রার্থীদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ না করা, প্রত্যাশিত সেবা প্রদানে সহযোগিতা না করা, আবেদনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতা না করা, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অফিসে অবাঞ্ছিত ব্যক্তির উপস্থিতি এবং অফিস পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার মতো বিষয় উঠে আসে। তদন্ত প্রতিবেদনে অফিস প্রধান হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই এবং বিষয়গুলো সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আলোকে অসদাচরণের আওতাভুক্ত হতে পারে মর্মে মতামত দেওয়া হয়।
৫ আগস্টের পর রাজশাহী অফিসের উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং রোজী খন্দকারকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে রাজশাহী থেকে বদলি করে বরিশাল বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে পদায়ন করা হয়। রোজী খন্দকারের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং বর্তমানে একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
একইভাবে নোয়াখালী পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট সেবা প্রদান, আর্থিক অনিয়ম এবং এমআরপি পাসপোর্ট ইস্যু বন্ধের বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা থাকা সত্বেও তা ইস্যু সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কর্মস্থলে পেশাগত নেতিবাচক আচরণ, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, পাসপোর্ট সেবা দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে অধিদফতরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলসমূহে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও জনসম্পৃক্ততা কম আছে- এ ধরনের কর্মস্থলে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
উত্তরায় পদায়নের বিষয়ে অধিদফতরের আপত্তি
উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রমের প্রকৃতি অন্যান্য অনেক অফিসের তুলনায় অধিক সংবেদনশীল। এখানে বিপুলসংখ্যক সেবা প্রত্যাশী প্রতিদিন পাসপোর্ট সেবা গ্রহণ করেন। এ ধরনের অফিসে সেবার স্বচ্ছতা, দ্রুততা, দালালমুক্ত পরিবেশ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে আন্তরিক ও ইতিবাচক পেশাগত আচরণ সরাসরি অধিদফতরের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং বর্ণিত সব বিষয়ে মূল্যায়ন করে রোজী খন্দকারকে সংবেদনশীল কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়টি অধিদফতরের পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে।
রোজী খন্দকারের বিষয়ে অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তিনি তো অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা। অধিদফতরকে পাশ কাটিয়ে তিনি বদলি হয়ে আসলেন। তার বিরুদ্ধে যেহেতু বিপুল অভিযোগ, সেখানে তিনি সঠিকভাবে কাজ করবেন এমন প্রত্যাশাই সবার ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। উপরন্তু তিনি তার যোগদানের বিষয়টিও মহাপরিচালককে জানাননি। এরপর তিনি সেই দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে আবারও অনিয়মের দিকে গেলেন।
তারা বলেন, এতে করে তিনি শুধু নিজের নয়, পুরো অধিদফতরকে প্রশ্নের সন্মুখন করলেন।
রোজী খন্দকারের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানেতে রোজী খন্দাকরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার সম্পর্কে অধিদফতরের কী ভাবনা বা আমার সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ে কী চিঠি লিখেছে তা জানি না। এ বিষয়ে আমি বলতেও পারবো না।
যোগদানের বিষয়ে মহাপরিচালককে না জানানো, ফোন না ধরা এবং অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সরকারি কাজে ব্যস্ত রয়েছি। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।
অধিদফতরের বক্তব্য
এ বিষয়ে অধিদফতরের উপ-পরিচালক ( প্রশাসন) তারিক সালমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রোজী খন্দকারকে শোকজ করা হয়েছে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে কেন তিনি তার যোগদানের বিষয়টি মহাপরিচালককে জানাননি। তিনি আরও বলেন, তার যোগদানের পরপরই কেন দুদক অভিযান পরিচালনা করলো সেই বিষয়ের ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।