অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে উঠে আসা অনিয়ম ও দুর্নীতির হিসাব এবার তদন্ত ও জবাবদিহির পথে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিগত সরকারের আমলের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেগুলোতে অনিয়ম বা দুর্নীতির আলামত পাওয়া গেছে, সেগুলোর তদন্তও হচ্ছে। কয়েকটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সংসদে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে শ্বেতপত্রে থাকা বিপুল আর্থিক অনিয়মের হিসাব থেকে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত কতটা স্বাধীন, প্রমাণনির্ভর এবং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকে সেটাই এখানে মুখ্য বিষয়। কারণ শ্বেতপত্রে উঠে আসা পর্যবেক্ষণ বা ক্ষতির হিসাব এক বিষয়, আর নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির দায় প্রমাণ করা আরেক বিষয়। এ জন্য প্রকল্প অনুমোদনের নথি থেকে দরপত্র, ব্যয় সংশোধন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থ ছাড়, ঠিকাদার নির্বাচন, সুবিধাভোগী এবং অর্থের গতিপথসহ প্রতিটি পর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে। এখানেই সরকারের ঘোষণাটি কতটা কার্যকর হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে রূপ নেয় তা দেখার বিষয়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘‘অর্থনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল, বর্তমান সরকার সেটি পরীক্ষা করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।’’ একই অধিবেশনে তিনি জানান, বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির আলামত পাওয়ার পর সেগুলো তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
শ্বেতপত্রে কী ছিল
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনায় অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। তিন মাসের কাজ শেষে কমিটি ১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়। শ্বেতপত্রের অন্যতম আলোচিত অংশ ছিল—সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দুর্নীতি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুষ ও অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ তখনকার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। বড় প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে গড়ে ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে এবং বাস্তবায়ন পাঁচ বছরের বেশি পিছিয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাতটি আলোচিত বৃহৎ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা বলেও শ্বেতপত্রের বিশ্লেষণে উঠে আসে। এসব প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, পদ্মা রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প ছিল।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অতীতের প্রকল্পে শুধু ব্যয়ের ব্যবধান পাওয়া গেলেই সেটিকে দুর্নীতির চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। কোথায় যৌক্তিক কারণে ব্যয় বেড়েছে, আর কোথায় যোগসাজশ, অস্বচ্ছ দরপত্র, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে—সেই পার্থক্য নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
‘প্রকল্পের পুরো চেইন যাচাই করতে হবে’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মেগা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে এবং অভিযোগ, প্রমাণ, প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র, অর্থায়ন ও সুবিধাভোগীদের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে জনগণের আস্থা বাড়বে। দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্র, নিয়মিত নিরীক্ষা, সংসদীয় তদারকি ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে জবাবদিহি শক্তিশালী হবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয় কমবে।”
এই অর্থনীতিবিদের বক্তব্য অনুযায়ী একটি অতীতের দায় নির্ধারণ, অন্যটি ভবিষ্যতের প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যবস্থা তৈরি করা—যাতে একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তির সুযোগ সংকুচিত হয়।
আমলাতন্ত্রনির্ভর তদন্ত নিয়ে আপত্তি
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তবে তদন্তের কাঠামো নিয়ে তিনি সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “আমি এটাকে রাজনৈতিক বক্তব্য বলবো না। এটা সংসদে আলোচনার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী সেটা বলবেন। ঠিকই আছে। এটা যৌক্তিক, প্রত্যাশিত এবং তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটাতে সুফল পেতে হলে দুইটা জিনিস করতে হবে। একটা হচ্ছে, সরকারের উদ্যোগে যদি তদন্ত হয়, সেটা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে। আমলাতন্ত্র-নির্ভর যদি হয়, তাহলে এখানে বাস্তব চিত্র আসবে না। কারণ আমলাতন্ত্র নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। আমলাতন্ত্রই বাংলাদেশে একটা মেগা দুর্নীতির বড় জায়গা। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির মূল চালিকাশক্তি আমলাতন্ত্র। কাজেই তাদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে যদি তদন্ত প্রতিবেদন হয়, সেটা নিরপেক্ষ হবে না। সেটা কার্যকর হবে না। বাস্তবে যারা দায়ী তাদের বিচারের আওতায় আনা যাবে না। এক ধরনের বিচারের নামে প্রতিশোধ হবে। এরচেয়ে বেশি কিছু হবে না।”
দ্বিতীয় শর্ত হিসেবে দুদকের স্বাধীনতার কথা তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দ্বিতীয়ত দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য যেহেতু সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রতিষ্ঠান আছে দুর্নীতি দমন কমিশন, সেই কমিশনের কাছে প্রত্যাশা থাকবে—প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের পক্ষ থেকে বলা উচিত যে আমরা দুদককে দায়িত্ব দিয়েছি, দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে। সরকারি, রাজনীতিক বা আমলাতান্ত্রিক থেকে যারা দুর্নীতির জন্য দায়ী তাদের পরিচয় যাই হোক, দুদক তাদের জবাবদিহির আওতায় আনবে। এই অবস্থান যদি হয় সরকারের, তাহলে ইতিবাচক হবে।”
দুদকের হাতে কী সুযোগ
আইন অনুযায়ী দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালানো এবং তার ভিত্তিতে মামলা করার ক্ষমতা দুদকের রয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে কমিশন সরকার বা সরকারি সংস্থা থেকে প্রতিবেদন ও তথ্য চাইতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ কর্মকর্তার বিশেষজ্ঞ সহায়তাও নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কমিশনকে সহযোগিতা করতে বাধ্য। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৩ ধারায় সেই সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে শ্বেতপত্রের তথ্য ধরে বিগত সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান দুদকের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব কিনা জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, “অবশ্যই সম্ভব। প্রয়োজন হলে অন্য কোনও সংস্থার সহায়তা লাগলে সেটা নেওয়ারও আইনগত সুযোগ দুদকের রয়েছে।”
দুদকের সাংগঠনিক কাঠামোতেও বড় ধরনের দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং বিশেষ গুরুত্বের দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশ্ন এখন শ্বেতপত্রে দুর্নীতির কত বড় অঙ্ক উঠে এসেছিল সেটা নয়। সেই তথ্য থেকে কতটা গ্রহণযোগ্য তদন্ত দাঁড় করানো যায়, সেটিই মূল বিষয়। কোন প্রকল্প তদন্তের তালিকায় রয়েছে, কী অভিযোগে তদন্ত হচ্ছে, কারা তদন্ত করবে, প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কিনা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা, এসবের ওপরই নির্ভর করবে উদ্যোগটির গ্রহণযোগ্যতা।
তারা বলছেন, শ্বেতপত্র দুর্নীতির একটি বিস্তৃত চিত্র সামনে এনেছে। সরকারের কাজ এখন সেই চিত্রকে প্রমাণ, তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করা। স্বাধীনভাবে সেটা করা গেলে উদ্যোগটি জবাবদিহির নজির হতে পারে। আর তদন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বদলে সামনে আসবে সেই পুরোনো প্রশ্ন। দুর্নীতিবাজদের ধরা নাকি যারা ক্ষমতায় থাকে না, দুর্নীতির বিচারের নামে হেনস্তা করা।