যাদের ছেলে সন্তান নেই, এমন পরিবারের বাবা-মা জীবিত থাকতেই মেয়েকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন এবং একই সঙ্গে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। এমন সুযোগ রেখেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’।
সম্পত্তি রেজিস্ট্রির পর এই ধরনের দান সাধারণভাবে ‘অপরিবর্তনীয়’ হওয়ায় শুধু দাতার ইচ্ছা পরিবর্তনের কারণে তা বাতিলের সুযোগও থাকছে না নতুন আইনে। তবে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে দান করা সম্পত্তি বিক্রির সুযোগও থাকছে। পিতা-মাতা ও সন্তান উভয়ে সম্মত হয়ে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন। কোনও এক পক্ষ সম্মতি না দিলে বিশেষ প্রয়োজন প্রমাণ করতে পারলে আদালতের অনুমতি চাওয়া যাবে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’-এ নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এতে বাবা-মা বা দাদা-দাদি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এই ধরনের দানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে নতুন বিধানটি সাধারণ গিফট, মুসলিম হেবা বা অন্য স্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতাকে প্রভাবিত করবে না।
শুধু কন্যাসন্তান থাকলে কেন এই আইন
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনও ব্যক্তি পুত্রসন্তান না রেখে শুধু কন্যাসন্তান রেখে মারা গেলে কন্যা উত্তরাধিকারী হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্য ওয়ারিশেরও সম্পত্তিতে অধিকার তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু কন্যাসন্তান থাকলে বাবার মৃত্যুর পর তার সব সম্পত্তি কন্যার পান না। এই বাস্তবতায় কোনও বাবা যদি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি মেয়ের নামে দিয়ে যেতে চান, নতুন আইনের বিধানটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে।
বাবা সম্পত্তি মেয়েকে দান করার পরও দলিলে নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ, আইন অনুযায়ী বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তিটি ভোগ করবেন, কিন্তু একই সঙ্গে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়াটিও সম্পন্ন হবে।
নতুন আইনটির ফলে কন্যাসন্তানের মুসলিম উত্তরাধিকার বা মিরাসের হিস্যা বাড়ছে না। মিরাস বলতে, কোনও ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তিনি যে সম্পত্তি রেখে যান, সেই সম্পত্তিতে প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশের যে অংশ নির্ধারিত হয়, তাকে বোঝায়।
নতুন আইনে সেই উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় কন্যার প্রাপ্য অংশ বাড়ানো হয়নি। বরং বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় কন্যার কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি পথ তৈরি হচ্ছে।
ফলে পুত্রসন্তান নেই; এমন কোনও বাবা যদি চান, তার জীবদ্দশাতেই সম্পত্তি মেয়ের কাছে চলে যাক এবং একই সঙ্গে তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন, তাহলে নতুন বিধানটি সেই সুযোগ দিচ্ছে।
মেয়ে কি দান পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে?
নতুন আইনে ১২২ক-এর অধীনে দান করা সম্পত্তি দানগ্রহীতা বিক্রি করতে পারবে কি না; এ বিষয়ে সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা; দানগ্রহীতার কাছে সম্পত্তির স্বত্ব হস্তান্তর এবং দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন ভোগাধিকার।
অর্থাৎ, বাবা মেয়েকে সম্পত্তি দান করে নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিলে মেয়ের কাছে সম্পত্তির স্বত্ব গেলেও বাবার সংরক্ষিত ভোগাধিকার বহাল থাকবে। ফলে মেয়ের পরবর্তী কোনও হস্তান্তর বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও বাবার ওই সংরক্ষিত অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।
জরুরি প্রয়োজনে দান করা সম্পত্তি দানকারী অথবা দানগ্রহীতা বিক্রি করতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হ্যাঁ, পারবে। দুইজন মিলেও পারবে। আবার যদি একজন দানকারী অথবা দানগ্রহীতা সম্মতি না দেয়, তাহলে এক পক্ষ কোর্টে, ডিস্ট্রিক্ট জজের কাছে পারমিশন চেয়ে বিক্রি করতে পারবে। যদি জেনুইনলি দেখাতে পারে যে, বিশেষ করে বাবা-মায়ের জীবনধারণের জন্য এটা প্রয়োজন। যেমন মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টের জন্য প্রয়োজন; আদালত সে ক্ষেত্রে বিশেষ পারমিশন দিতে পারবে।’
নতুন আইনে এমনও বলা হয়েছে, দানগ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী দানগ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে এর পরও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে বহাল থাকবে।
দান কি পরে বাতিল করা যাবে?
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১২২ক-এর অধীনে করা গিফট রেজিস্ট্রেশনের পর সাধারণভাবে তা অপরিবর্তনীয় থাকবে। অর্থাৎ, বাবা-মা পরে শুধু মত পরিবর্তন করলেই দান করা সম্পত্তি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে ১২২খ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনও প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও দানগ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘১২২ ধারায় ইসলামীভাবে যে আইন আছে, সেটাকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এইটা হলো প্রথম কথা। দ্বিতীয় হচ্ছে—১২২-এর চার ধারায় ইসলামীভাবে যে হেবা, গিফট বা অন্য কোনও মোড অব ট্রান্সফার, সেইটা এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইসলামিক ল’-এ এখানে কোনওভাবেই শরিয়া ল’কে টাচ করা হয়নি। এটা সম্পত্তি হস্তান্তরের বিকল্প একটা পথ হিসেবে বাবা-মাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। যাতে সন্তানরা বাবা-মাকে শেষ জীবনে কষ্ট দিতে না পারে, সেই কারণে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। যেটা ইসলামিক আইনে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথা বলা হয়েছে, সেটাই এখানে করা হয়েছে। অথচ বিরোধী দল এটাকে ভুল ব্যাখ্যা, অপব্যাখ্যা দিয়েছে।’
আইন নিয়ে বিরোধিতা
নতুন এই আইন পাসের সময় বিরোধী দল ও জোট সদস্যরা জাতীয় সংসদে বিরোধিতা করেছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনও আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে। দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থী। এতে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর যুক্তি নেই। বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে। এই বিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে এর পক্ষে ভোটদানকারীদের দায়ভার নিতে হবে।’
এই বিরোধিতা করে বিলটি সংসদে জনমত যাচাইয়ে দিলে বিরোধী দল প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।
জাতীয় সংসদে ওইদিন শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, ‘আমরা বয়স্ক বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কমানোর উদ্দেশ্যের বিরোধিতা করছি না। কিন্তু ইসলামের স্বীকৃত হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও আইন মেনে নেওয়া যায় না। হেবা শুধু রেজিস্ট্রেশন করলেই সম্পূর্ণ হয় কি না, বাস্তব দখল ও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরিত হতে হবে কি না; এসব বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জীবনভর দাতার ভোগদখলের অধিকার থাকলে এটি হেবা নাকি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ব্যবস্থা, সে প্রশ্ন থাকবে।’
সরকারি দল ও সংশ্লিষ্টদের ভিন্নমত
নতুন এই আইন নিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে জানিয়েছিলেন, যাদের শুধু কন্যাসন্তান আছে, তিনি যদি মারা যান তাহলে অন্য ওয়ারিশরা সম্পত্তির অংশ পান। যেসব ওয়ারিশদের সঙ্গে হয়ত সম্পর্কই ছিল না। এতে যার পুত্রসন্তান নেই তার কন্যাসন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিরোধী দলের বিরোধিতার জবাবে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে এই বিলের বিরোধিতা করা হচ্ছে। শরিয়াহর দোহাই দেওয়া হলে প্রচলিত অন্য আইনগুলোও কি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী হতে হবে? সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নিয়ে তাদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেবে; এটা হতে পারে না।’
রুমিন ফারহানার অভিমত
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনের কথাও বলেন তিনি।
রুমিন ফারহানা জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, ‘বাবা-মাকে সন্তানদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল থেকে রক্ষায় বিলটি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তবে সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ রাখা উচিত। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে।’
দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
কন্যাসন্তানের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
একমাত্র কন্যাসন্তানের পিতা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান বার্তা সম্পাদক মুরসালিন নোমানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আইনটি করার জন্য আইনমন্ত্রী এবং সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। আইনটিতে কন্যাসন্তানদের জমি রেজিস্ট্রি করে তাদের যেমন নিরাপত্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, তেমনি পিতা-মাতার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কন্যাসন্তানকে সম্পত্তি দান করার ক্ষেত্রে যেমন সমস্যা ছিল, তেমনি সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার পর পিতা-মাতার নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল। এই আইন করায় সন্তানদের জমি লিখে দিলেও সম্পত্তিতে দানকারী পিতা অথবা মাতার ভোগদখলের অধিকার থাকবে। আইনটি পাস করায় সরকারকে আবারও সাধুবাদ জানাচ্ছি।’
তিন কন্যার পিতা, আরেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘এই আইন পাসের পর কন্যাসন্তানদের পিতা-মাতারা নিশ্চয়ই নিরাপদ বোধ করছেন। আমার তিন কন্যা, আমি তাদের জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে পারছিলাম না। একদিকে আমি মারা যাওয়ার পর আমার সম্পত্তির শুধু আমার কন্যারা মালিক হতো না। অন্য ওয়ারিশরাও মালিক হতো, পুত্র সন্তান না থাকায়। আবার সম্পত্তি সব কন্যাদের রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কোনও কারণে কন্যারা যদি তাদের পিতামাতাকে না দেখে, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে পরিণতি কী হবে? মেয়েরা যদিও পিতা-মাতার প্রতি বেশি দরদ রাখে, দেখাশোনা করে, কিন্তু সমাজ বাস্তবতায় তা অনেক সময় হয়ে ওঠে না। এই আইনটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
তার ভাষ্য, ‘আমি মনে করি, এই আইনটি জরুরি ছিল। বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের পিতা-মাতা ও কন্যাদের নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আইন নিয়ে কিছু মানুষের বিরোধিতা আছে, সে ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করতে আইনটি সংশোধন করতে পারবে সরকার।’
১৯৬১ সালের আগে এতিমরা যেভাবে সম্পত্তি বঞ্চিত হতেন
১৯৬১ সালের ‘মুসলিম ফ্যামিলি লজ অর্ডিন্যান্স’-এর আগে কোনও ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের আগে মারা গেলে, ওই মৃত সন্তানের ছেলে-মেয়েরা সাধারণভাবে দাদা-দাদির সম্পত্তিতে তাদের বাবা বা মায়ের জায়গায় উত্তরাধিকারী হতে পারতেন না।
ফলে বাবা মারা যাওয়ার আগে ছেলে মারা গেলে, ওই ছেলের সন্তানরা দাদা-দাদির সম্পত্তিতে তাদের বাবার অংশ থেকে বঞ্চিত হতে পারতেন।
১৯৬১ সালের আইনের ৪ ধারায় এই অবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। কোনও ছেলে বা মেয়ে বাবা-মায়ের আগে মারা গেলে, ওই মৃত সন্তানের ছেলে-মেয়েরা তাদের বাবা বা মা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সেই সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকারী হন। ফলে এতিম নাতি-নাতনিদের উত্তরাধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।
নতুন আইনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন ভাই ছাড়া বোনেরা বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতেন, তা হওয়ার সুযোগ বন্ধ হলো। ১৯৬১ সালের আইনের উদ্দেশ্য পুরো সম্পন্ন হলো বলেও মনে করে সরকারি দল।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘১৯৬১ সালের আইন আরও বেশি কন্ট্রাডিক্ট করে। কিন্তু সেই তুলনায় এই আইন অত্যন্ত আধুনিক একটা আইন এবং মুসলিম ল-কে, শরিয়াকে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না।’
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, পুত্রসন্তানহীন বাবা-মা জীবদ্দশায় কন্যাকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারবেন, আবার নিজেদের জীবনকালীন ভোগাধিকারও সংরক্ষণ করতে পারবেন। রেজিস্ট্রির পর শুধু দাতার ইচ্ছা পরিবর্তনের কারণে সেই দান বাতিল করার সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে প্রচলিত হেবা ও সাধারণ গিফটের পথও বহাল থাকছে।