আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘মনগড়া নয়’ : দুদক

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ‘মনগড়া নয়’ বলে দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে যেসব দেশে অর্থ পাচারের কথা বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে সেসব দেশের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

দুদক সচিব বলেন, ‘অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী ধাপে গিয়েছি। অনুসন্ধান চলমান আছে। অনুসন্ধান বা তদন্তে যা পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করবো। এখানে মন মতো কাজ করার কোনও সুযোগ নেই।’

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘‘অনেক কথাই বলা হচ্ছে। আপনারা লক্ষ্য রাখেন, আমরা কী করছি দেখেন। তাহলেই বুঝতে পারবেন— এটা মনগড়া কিনা কিংবা আমরা কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছি কিনা।’’

তিনি বলেন, ‘‘অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’’

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হবে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, ‘‘আইনের আওতায় প্রয়োজন হলে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলআর) পাঠানো হবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘যেসব দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে যদি সারবত্তা পাওয়া যায়, তাহলে দুদক পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হবে।’’

দুদক সচিব জানান, অনুসন্ধান ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই কমিশন পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারণ করবে।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নথি দুদকে

এদিকে আসিফ মাহমুদ দায়িত্বে থাকার সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুদকের হাতে এসেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর দুদক এসব নথি তলব করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দুদকে পাঠানো হয়।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়।

পরদিন অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চার ধরনের নথি চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় দুদক।

নতুন অভিযোগও অনুসন্ধানে

গত রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারসহ নতুন বেশ কয়েকটি অভিযোগ পৃথকভাবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হবে।

নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার থেকে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ তার দুই বোনজামাই ও ভাগনিকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন এবং দুদকের চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে। এছাড়া পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে; এর সত্যতা যাচাই করছে দুদক।

দুদক জানায়, নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়নে জনপ্রতি ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানো, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে।

অভিযোগে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে নিয়োগ এবং ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে আব্দুল লতিফ খানকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টিও অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অর্থ সংগ্রহ করতেন। তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুস লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণ, পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও দামি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়গুলোও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। তার দাবি ছিল, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে তার মানহানি করা হয়েছে।

এরপর গত ১০ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়।

তবে তার আগের দিন, ৯ সেপ্টেম্বর, দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন যে, আইন ও বিধি অনুযায়ী আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে।