এমপি নজরুলের রিমান্ড শুনানিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানলেন প্রসিকিউটর, থামালেন বিচারক

দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আলোচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের রিমান্ড শুনানিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর। তবে তাকে থামিয়ে দেন বিচারক।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে রিমান্ড শুনানিতে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টানেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী। বিচারক তাকে থামিয়ে মামলার বিষয়ে বলতে বলেন।

রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টোদিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

রাতেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।

এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে এদিন দুপুরে শেরেবাংলা নগর থানা থেকে দুই আসামিকে আদালতে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা ২২ মিনিটের দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।

পাঁচটি কারণ দেখিয়ে দুই আসামিকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকার।

বেলা ৩টা ১২ মিনিটের দিকে সিঁড়ি মাড়িয়ে তাদের পঞ্চম তলার এজলাসে তোলা হয়। এ সময় তাদের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল। আসামির কাঠগড়ায় নেওয়ার পর এসব খুলে দেওয়া হয়।

বিচারক এহসানুল ইসলাম বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে এজলাসে ওঠেন। ৩টা ১৬ মিনিটের দিকে মামলার শুনানি শুরু হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শামসুজ্জোহা রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘দুই আসামির মধ্যে একজন রানিং এমপি, আরেকজন সাবেক সংসদ। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।’

এ সময় নজরুল ইসলাম আরেক আইনজীবীকে ডেকে বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা বলেনি।’

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নজরুল ইসলাম চারবারের এমপি। এ মামলায় তাদের রিমান্ডে নেওয়ার মতো বিন্দু-বিসর্গ কিছু উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। রাষ্ট্রের একজন আইন কর্মকর্তা। আমরাও মৃত্যুর বিচার চাই। তবে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রিমান্ড বাতিল করে তাদের জামিন দেওয়া হোক। আমরা সবকিছুতে সহযোগিতা করবো। পালিয়ে যাওয়ার মতো লোক আমরা নই।’

আবার একজন আইনজীবীকে ডেকে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রবিবার আমি আদালতে ছিলাম।’

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘মামা ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়ে করেন এমপি নজরুল ইসলাম। প্রথম স্ত্রীকেও রাজি করান মরিয়মকে বিয়ে করাতে। ওই মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হোটেল, মোটেলে যাওয়ার ভিডিও দেখা যায়। তারা ন্যাম ভবনে বাস করতেন। ২০ তারিখে মরিয়ম আত্মহত্যা করে। সুইসাইড নোটও পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িয়ে দিতে পারি না। সবকিছুতে পূর্বপরিকল্পনা ছিল। আমরা শুনে এসেছি, জামায়াতে ইসলামীর লোক সৎ।’

এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এ মামলার ঘটনায় থাকি। পলিটিক্যাল বিষয়ে না যায়।’

পরে প্রসিকিউটর ফারুকী বলেন, ‘সৎ লোকের শাসন দেখছি। তাদের রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।’

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তারা দুইজনই বয়স্ক মানুষ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। নজরুল ইসলাম একজন আইন প্রণয়ন কর্মকর্তা। ঘটনা একটা ঘটে গেছে।’

উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে আদালত নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা বেগমকে একদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম।

এজাহারে বলা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে বলে গেছেন। এর মধ্যে রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে বাদীকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন বাবা মাসুম বিল্লাহ।

তিনি এজাহারে লিখেছেন, লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান।

একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’

আরেকটিতে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি।

‘আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’

আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’

অপর লেখায় আছে, ‘কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’

রোববার বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে মরিয়ম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন।

পরে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ফেসবুকে পোস্টে ওই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দল এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।