এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না, সরকার টিকতে পারে না: আখতারুজ্জামান

‘রাষ্ট্রের মিস-ম্যানেজমেন্ট আর চলতে পারে না। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। এরকম অবস্থায় কোনও সরকার টিকে থাকতে পারে না’— আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।

শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রিজনভ্যানে করে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আনা হয়। পরে তাকে আদালত ভবনের নিচতলায় রাখা হয়।

প্রিজনভ্যানে থাকা অবস্থায় গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘নির্যাতন দিয়ে আমাদের সংগ্রাম থামানো যাবে না। আমরা বাংলাদেশের জনগণের জন্য, বিশেষ করে প্রবাসীদের স্বার্থের জন্য লড়ে যাবো। আজীবন লড়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা প্রবাসীদের সমস্যার সমাধান করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই রাষ্ট্রের মিস-ম্যানেজমেন্ট আর চলতে পারে না। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। এরকম অবস্থায় কোনও সরকার টিকে থাকতে পারে না। আমরা মনে করি, আজকে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে চালানোর জন্য, মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য— আমাদের নতুন করে সংগ্রামে নামতে হবে। ইনশাআল্লাহ, জামায়াতে ইসলামী সেই সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।’

এর কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ সদস্য প্রিজনভ্যানে প্রবেশ করে তার হাতে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরানোর চেষ্টা করেন। আখতারুজ্জামান এতে আপত্তি জানান।

পরে হেলমেট পরানো অবস্থায় প্রিজনভ্যান থেকে তাকে বের করার সময় তিনি হেলমেটটি ছুড়ে ফেলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘‘কেন হেলমেট পরবো?, … সরকারের অবৈধ আদেশ মানি না।’’

পরে মাথায় হেলমেট ছাড়াই তাকে এজলাসে নেওয়া হয়। আদালতে নেওয়ার সময় তাকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।

শুনানির সময় সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা

আখতারুজ্জামানের শুনানি চলাকালে আদালতকক্ষে কোনও সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। প্রসিকিউশন বিভাগের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। এ বিষয়ে পুলিশের কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রায় এক ঘণ্টা শুনানি শেষে এজলাস থেকে বেরোনোর পর আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘‘এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।’’ এ সময় কয়েকজন আইনজীবীকেও তিনি বলেন, ‘‘আপনারা লেখেন, এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে।’’

শুনানি শেষে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সিএমএম আদালতের আটতলা থেকে আখতারুজ্জামানকে নিচে নামানো হয়। এ সময় তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘‘আমার পেছনে তারা জোর করে হাতকড়া দিয়ে হেলমেট পরিয়ে দিয়েছিল। আমি পরিনি। এই দেশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কররবোই করবো। কত বছরের জেল দেবেন, দেন। প্রতিবাদ চলবে।’’

পিপির বক্তব্য

পরে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী  বলেন, ‘‘আসামি আদালতকে জানিয়েছেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন। আদালত তাকে জানিয়েছে, প্রতিবাদ করা তার অধিকার। তবে প্রতিবাদের ভাষা সংযত হতে হবে এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে কাউকে আঘাত করা যাবে না।’’

পিপি বলেন, ‘‘আদালতের এই বক্তব্যের পর আখতারুজ্জামান আদালতের প্রতি আরও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। আদালত অনেক সময় আসামিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয় এবং তার কাছ থেকে তথ্য জানার জন্য বা তাকে সহযোগিতা করার জন্য তার সঙ্গে আলোচনা করে।’’ কিন্তু অভিযুক্ত তার বক্তব্যের মধ্যে কোনও ধরনের শৃঙ্খলা বজায় রাখেননি বলে দাবি করেন তিনি।

ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, ‘‘আদালতে আসার শুরুতেই আখতারুজ্জামান পুলিশের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পুলিশসহ আদালতে উপস্থিত সবাইকে বের করে দিতে বলেন। তিনি পুলিশ, সাংবাদিকসহ কাউকেই আদালতে রাখতে চাননি এবং আদালতের প্রতিও বিরূপ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।’’ প্রসিকিউশন পক্ষের বিরুদ্ধেও তিনি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন বলে দাবি করেন পিপি।

আইনজীবীর অভিযোগ

অন্যদিকে, আখতারুজ্জামানের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ করেন, ‘‘আজকে ডিসি প্রসিকিউশন সাংবাদিক, আইনজীবীদের আদালত এবং আদালতের বারান্দায় ঢুকতে দেননি।  আমি মনে করি, এটা নিন্দনীয় ঘটনা। কোনও কিছু গোপন করার জন্য সাংবাদিকদের এমবার্গো (বিধিনিষেধ) দিয়েছেন কিনা, সেটাও আমি জানি না। আগামীতে যেন এভাবে না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’’

তিনি বলেন, ‘‘এত তাড়াতাড়ি কোনও মামলার শুনানিও হয় না। বন্ধের দিন সাধারণত তিনটা থেকে সাড়ে তিনটায় শুনানি হয়।’’

প্রসিকিউশন ও পিপির আদালতে আগে আসার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘কেন তারা আদালতে আগে আসেন, এটা আমার বোধগম্য নয়।’’

শুনানিতে আখতারুজ্জামান ‘সুন্দর বক্তব্য’ দিয়েছেন দাবি করে তার আইনজীবী বলেন, ‘‘সাংবাদিকরা ওখানে থাকলে ভালো হতো। এই মামলা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এটা জামিনযোগ্য মামলা।’’

আদালতপাড়ায় জামায়াত নেতাকর্মীদের ভিড়

এদিকে, মেজর অব. আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হবে— এ খবর পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আদালতপাড়ায় জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা সিএমএম আদালতের গেটের সামনে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

আখতারুজ্জামানকে কারাগারে নেওয়ার সময়ও তাদের প্রিজনভ্যানের পেছনে ছুটতে দেখা যায়।

যেভাবে গ্রেফতার

গত ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন ধামালকোট এলাকার ১০ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর নিজ বাসা থেকে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।