কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বাধা ‘আইনের মারপ্যাঁচ’, বাড়ছে অপরাধ

চলতি মাসের ২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে ‘কিশোর গ্যাং’। এরপর প্রায় প্রতিদিনই অভিযানে ‘কিশোর গ্যাং’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আটক কিংবা গ্রেফতারের কথা জানাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুধু কুমিল্লাতেই ‘কিশোর গ্যাং’ ও ‘বখাটেদের’ বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে মোট ১ হাজার ৬৭২ জনকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজধানীতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিএমপির অপরাধী চক্রের তালিকায় থাকা ৮৯৩ জনের বয়সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের ৫৩ শতাংশের বয়স ২০ বছর বা তার কম। এর মধ্যে ১৫২ জন, অর্থাৎ ১৭ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা আইনের জটিলতা। জনবলের অভাব ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অন্যদিকে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা এবং প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

বিগত কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচিত্র নামে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা চলছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ পেজ খুলে ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের বেপরোয়া আচরণকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী ও এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। মাদক ব্যবসা ও দখলবাজিসহ নানা অপকর্মে তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে। এলাকার বা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে চপলমতি কিশোররাও নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে উৎসাহী হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

ডিএমপির তালিকায় প্রতি ছয়জনে একজন ১৮ বছরের কম বয়সী

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীতে সক্রিয় ১২২টি অপরাধী চক্রের তথ্য রয়েছে তাদের তালিকায়। তালিকায় মিরপুর শীর্ষে, আর সহিংসতায় মোহাম্মদপুর এগিয়ে।

চক্রের সঙ্গে জড়িত ৮৯৩ জনের বয়সের তথ্য রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫২ জন বা ১৭ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ৩২২ জন বা ৩৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ তালিকায় থাকা মোট ব্যক্তির মধ্যে ৪৭৪ জন বা ৫৩ শতাংশের বয়স ২০ বছর বা তার কম।

তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, এসব চক্র চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা এবং অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধী চক্র রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং কুখ্যাত অপরাধীদের সহায়তা পেয়ে থাকে।

আইনের জটিলতা বড় কারণ বলছে পুলিশ

পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তিন কারণে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে। এগুলো হলো আইনের জটিলতা, জনবলের অভাব ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা।

তারা জানান, বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সী অপরাধীদের উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করা যায় না, সাধারণ আদালতে বিচার করা যায় না এবং জেলেও রাখা যায় না।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিশু বা কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। কিংবা একই থানায় তাকে অন্য দায়িত্বে পাঠানো হয়। সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন সময় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেশিরভাগ সময় তা সম্ভব হয় না।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গনি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) বুধবার সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা না যাওয়ার প্রধান কারণ পারিবারিক শিক্ষা। সন্তান সন্ধ্যার পর বাসা থেকে কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। অভিভাবক সচেতন হলে কিশোর অপরাধ আস্তে আস্তে কমে আসবে।

তিনি বলেন, শিশু-কিশোররা অপরাধ করলে মোবাইল কোর্ট করা, সাধারণ আদালতে বিচার করা ও জেলেও রাখা যায় না। অর্থাৎ তাদের প্রতি কঠোর হওয়ার সুযোগ নেই। তাই কিশোর অপরাধ দমনে পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবার থেকেই সুশিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় শঙ্কায় অভিভাবক

ইকবাল রোডে মোহাম্মদ প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র জাকারিয়া জামান। তার মা শিরিন আক্তার প্রতিদিন ছেলেকে স্কুলে নিয়ে আসেন এবং ছুটির পর বাসায় নিয়ে ফেরেন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মোহাম্মদপুরে থাকার কারণে ভয় একটু বেশি। ছেলে বখে যায় কি না, সেই আশঙ্কায় সংসারের অন্য কাজ ফেলে সারাদিন ছেলের স্কুল ও টিউশনের পেছনে ছুটতে হয়।

তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ বেড়েই চলছে। সরকারের উচিত শিশুদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা। শিশু অপরাধ দমন করতে না পারলে আমাদের সব আয়োজন ব্যর্থ হবে।

ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. আব্দুল্লাহ। তার মা আফরিন বেগম জানান, ছেলেদের নিয়ে এখন খুব ভয় হয়। তাই সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখেন। ছেলে যেন খারাপ ছেলেদের বন্ধু না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকেন।

তিনি বলেন, কুমিল্লার ঘটনার পর ভয় আরও বেড়েছে। বাবা-মায়ের আরও সচেতন হওয়া উচিত। সন্তান কার সঙ্গে যাচ্ছে, কে তার বন্ধু, এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

মাদকের বিষে নীল কিশোর-তরুণ


২০২৫ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। মাদকাসক্তদের বেশির ভাগ পুরুষ। নারী ও শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তি রয়েছে।

ডিএনসির সমীক্ষা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়, চট্টগ্রাম মেট্রো (দক্ষিণ)-এর উপপরিচালক ও গবেষক মো. মানজুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশু-কিশোরদের পেটে ইয়াবা বহন থেকে শুরু করে অনেক অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমত, শিশুদের কেউ সহজে সন্দেহ করে না এবং কম মজুরিতে তাদের ব্যবহার করা যায়। মাদকের ক্যারিয়ার হওয়ার পর অনেক শিশু মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক আছেন, যারা পেটে মাদক বহন করা ও পাচারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শিশুদের সঙ্গে রাখেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে শিশুরা তা দেখে অভ্যস্ত হয়ে নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, কিশোর অপরাধ অপ্রতিরোধ্য হওয়ার আরেকটি বড় কারণ মাদক। এ ছাড়া আইনে শিশুদের বিরুদ্ধে জোরালো কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে।

পৃষ্ঠপোষকতায় কারা


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দারিদ্র্য, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা এবং মাদকের কারণে কিশোর গ্যাং অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে, যা রাজধানীসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের অপরাধী নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে অর্থদাতা, মাদকচক্র ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা যারা করছে, তাদের আগে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশ মাঠে তেমন সক্রিয় হতে পারেনি। কোথাও অভিযানে গেলেও তাদের ওপর হামলা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো অভিযান জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া রাজনীতিবিদদেরও দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে। যেকোনও ধরনের অপরাধ দমনে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পুলিশের পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাও এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে মঙ্গলবার পুলিশ সদরদফতরে বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেছেন, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী। মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের শূন্য সহনশীলতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশপ্রধান বলেন, এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।