হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছে পুলিশ।
রবিবার (৪ অক্টোবর) দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছি।
এ বিষয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক।
উল্লেখ্য শনিবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে এক দিনের রিমান্ড দেয় আদালত। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে আসা ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে বিমানবন্দরের ইউডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের উচ্চ-বাচ্যের একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে জামায়াতের ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেসময় বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর বাড়তি চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব হওয়া এবং জমজমের পানি না আসায় ‘উত্তেজিত’ হয়ে পড়েন এবং ‘অশোভন আচরণ’ করেন।
এর মধ্যে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। সঙ্গে সঙ্গে নির্বাহী পরিচালক সেখানে এসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এসময় তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান ‘অত্যন্ত রূঢ়, অশালীন ও অকথ্য ভাষায়’ গালিগালাজ করতে থাকেন।
এজাহারে বলা হয়, তখন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ‘অত্যন্ত শান্তভাবে’ অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘গেইট আউট ফ্রম হিয়ার’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন’, ‘মাইর খাইতে চান?’।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানের আচরণ ‘অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী’ ছিল জানিয়ে মামলায় বলা হয়, পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় ঢাকা-৫ আসনের এমপি কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে আখতারুজ্জামান ফের উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে হুমকি দেন, আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।
এ সময় তিনি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্পর্কে ‘অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর’ মন্তব্য করেন জানিয়ে এজাহারে বলা হয়, আখতারুজ্জামান বলেন, ‘হি ইজ এ বাস্টার্ড। বিমানবন্দরের জন্য কিছুই করছে না’। তখন আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ‘সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল’ করার ‘হুমকি’ দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় তখন দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআই এলাকায় ভিডিও ধারণ না করতে সংশ্লিষ্টদের নিষেধ করেন। তখন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান অতর্কিতে ওয়ারেন্ট অফিসার কামাল উদ্দিনের কাছে গিয়ে তাকে ‘অকথ্য ভাষায়’ গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।
মারধরের ঘটনাটি সিসিটিভির আওতাভুক্ত ছিল না দাবি করে এজাহারে বলা হয়, বিষয়টি ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব। পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন আখতারুজ্জামান। এসময় তিনি সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুঁড়ে ফেলেন।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের দুইবারের সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ (জুন) সালে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে তিনি জয়লাভ করেন। এবার আসনটিতে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েন তার ছোট ভাই আনিসুজ্জামান খোকন, যিনি বিএনপি থেকে ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ-১৯ আসনের এমপি হয়েছিলেন।
এদিকে ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি দিতে দেরি হওয়ার ঘটনায় দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ওই দুই কর্মকর্তা হলেন-ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেন। তাদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।