শাহবাগেই কেন এত পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ মেলে

মৃত্যুর পরও পরিচয় মিলছে না তাদের। কারও শেষ ঠিকানা হাসপাতালের মর্গ, কারও রায়ের বাজার কিংবা জুরাইন কবরস্থান। স্বজনের খোঁজ মেলে না, কেউ আসেন না মরদেহ নিতে। রাজধানীর ফুটপাত, সড়কের পাশ, পার্ক কিংবা হাসপাতাল চত্বর থেকে উদ্ধার হচ্ছে একের পর এক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। পুলিশের নথিতে তারা ‘অজ্ঞাতনামা’, আর দাফনের সময় ‘বেওয়ারিশ’।

রাজধানীতে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের অন্যতম প্রধান এলাকা শাহবাগ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে পরিচয়হীন মানুষের মরদেহ। শাহবাগ থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে এসব এলাকা থেকে ৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬৫ জনের পরিচয় মেলেনি।

এর আগে ২০২৫ সালে একই এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ৮১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। পরে মাত্র ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, গত ২১ মাসে এসব এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ১৬০টি মরদেহের মধ্যে ২৭ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। বাকি ১৩৩ জনই থেকে গেছেন পরিচয়হীন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ এলাকায় এক দিনেই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও চারজনের মরদেহ।

শুধু শাহবাগ নয়, রাজধানীর অন্য এলাকাতেও মিলছে অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের মরদেহ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানীর আটটি বিভাগে মোট ২১৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮১টি রমনা বিভাগে। এসব মরদেহের অধিকাংশই উদ্ধার করা হয় শাহবাগ থানা এলাকা থেকে। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে তেজগাঁওয়ে ৫১টি, ওয়ারীতে ২১টি, লালবাগে ১৭টি, মতিঝিলে ১৭টি, মিরপুরে ১২টি, উত্তরায় ৯টি এবং গুলশানে ছয়টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে রাজধানীতে ৭৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১টি রমনা বিভাগে, যার অধিকাংশই শাহবাগ এলাকার। এরপর মতিঝিল বিভাগে ১৪টি এবং ওয়ারী বিভাগে ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

শাহবাগেই কেন এত মৃত্যু

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান মানুষের অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে খাবার এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের সুযোগ থাকায় অনেক ছিন্নমূল মানুষ এখানে অবস্থান করেন।

জাতীয় ঈদগাহের পশ্চিম পাশে শাহ খাজা শরফুদ্দীন চিশতির (রহ.) মাজারে (হাইকোর্ট মাজার) প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। খাবারের আশায় সেখানে ভিড় করেন বিপুলসংখ্যক ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ। এ ছাড়া দোয়েল চত্বরের আশপাশের মাজার এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন এলাকাতেও খাবার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা মেডিক্যালের আশপাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান, অমর একুশে হল ও আবাসিক এলাকার সামনের আনন্দবাজার থেকেও খাবার সংগ্রহ করেন অনেকে। এসব কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাসমান মানুষ শাহবাগ ও ঢাকা মেডিক্যাল এলাকায় থাকেন।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাস্তায় বসবাস করা এসব মানুষের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। অসুস্থ হলে তাদের নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে না। ফলে গুরুতর অসুস্থতা নিয়েও অনেকে ফুটপাত কিংবা খোলা জায়গায় দিন কাটান। মৃত্যুর পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও তথ্য না থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

পৌনে ৬ বছরে ১ হাজার ৬৯০ মরদেহের ময়নাতদন্ত

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি এবং ২০২৫ সালে ৩৮৪টি মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ময়নাতদন্ত করা হয়েছে আরও ২৫৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের।

২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি মরদেহ এসেছে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, শীতকালে অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের মরদেহ তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভাসমান ও অসুস্থ মানুষের মধ্যে ঠান্ডাজনিত রোগ এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পুলিশের তথ্য ও মরদেহের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। তাদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসার অভাবে কারও কারও শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. মমতাজ আরা বলেন, বিভিন্ন স্থানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই সেপটিক শকে আক্রান্ত ছিলেন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে অকার্যকর হয়ে গেলে এ ধরনের রোগীদের মৃত্যু ঘটে।

পরিচয় শনাক্তে নানা চেষ্টা

অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের পর প্রথম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা। পুলিশ জানায়, প্রতিটি মরদেহের আঙুলের ছাপ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) মাধ্যমে এসব তথ্য জাতীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

কিন্তু যেসব ব্যক্তির কখনও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি হয়নি কিংবা যাদের আঙুলের ছাপ সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডারে নেই, তাদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার দীর্ঘ সময় পর মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় পচন ধরলে অনেক ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপসহ প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহও সম্ভব হয় না।

পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠানো হয়। পাশাপাশি ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের মাধ্যমেও পরিচয় শনাক্তের জন্য তথ্য প্রচার করা হয়। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কোনও স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে সেই নমুনা ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে।

ময়নাতদন্তের সময়ও পরিচয় শনাক্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেন ফরেনসিক চিকিৎসকরা। প্রয়োজন অনুযায়ী মরদেহের দাঁত ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং সিআইডিতে সংরক্ষণ করা হয়।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অজ্ঞাত হিসেবে যেসব মরদেহ উদ্ধার করি, সেগুলোর অধিকাংশেরই পরিচয় শনাক্ত হয় না। পরিচয় না পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে সেগুলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

তিন বছর নয় মাসে দাফন ২ হাজার ১৬৪ মরদেহ

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে মোট দুই হাজার ১৬৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে আরও ৪৬০টি মরদেহ।

পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এসব মরদেহ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজধানীর রায়েরবাজার ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।

শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগেই গত পৌনে ছয় বছরে এক হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। অন্যদিকে গত তিন বছর নয় মাসে রাজধানীতে দুই হাজার ১৬৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছে সংস্থাটি।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা প্রত্যেক মরদেহের তথ্য ও কবরের অবস্থানসংক্রান্ত তালিকা সংরক্ষণ করা হয়। দাফনের পর কোনও মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য বা স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের কবর চিহ্নিত করে দেওয়া হয়।