ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’: হাইকোর্ট

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবিকৃত করের ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে বলা মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ওই মামলায় প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’ বলেও মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

আয়কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া দুটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করেছিলেন হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের সাক্ষরের পর প্রকাশিত ১৫ ও ৩২ পৃষ্ঠার পৃথক রায়ে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। 

রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ন্যায্য রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য কোনও চেষ্টারই ত্রুটি রাখেনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ। এটি আবেদনকারীর কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ। আবেদনকারী একটি নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয়কে দীর্ঘায়িত করে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা সম্ভব ছিল। কিন্তু আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে প্রতিপক্ষকে তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার জন্য কোনও চেষ্টারই ত্রুটি রাখেনি।

আদালত আরও বলেছেন, দুটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য আরোপিত ৬৬৬ কোটি টাকার আয়করের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হলেও একই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭-২০১৯ করবর্ষের জন্য একই ধরনের আয়কর দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই আয়করের বৈধতা আদালতে ২০১৯ সালের ৩৬৩ নম্বর ইনকাম ট্যাক্স রেফারেন্সের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করলেও তা প্রত্যাহার করে নেয়।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আবেদনকারী তার নিজস্ব অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে ক্রমাগত একই বিষয় নিয়ে কথা বলে চলেছেন এবং এই আদালতের আদেশের প্রতি চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে উঠেছেন— যা প্রকারান্তরে আদালতের আদেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনেরই শামিল।

উক্ত রায়ে এনবিআরসহ বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়— যেন তারা আইন অনুযায়ী এবং যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে আবেদনকারীর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।

এ বিষয়ে ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বিস্তারিত রায় পর্যালোচনার পর তারা আপিল করবেন।

এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রত্যাহার করেন। একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতির কাছে এ মামলার নথি পাঠানো হয়।

পরে নতুন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য পাঠানো হয়। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭— এই করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় কর দাবি ঘিরে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট দায়ের করা হয়। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রায় রুল দেন। সে রুল খারিজ করে রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্টের নতুন এ বেঞ্চ। 

ফলে রিট খারিজ হওয়ায় আয়কর বাবদ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করতে পারবে এনবিআর— বলে জানিয়েছিলেন আইনজীবীরা।