জর্ডান প্রবাসী স্ত্রীকে হত্যার পর লাশ ৪ টুকরো, যে বর্ণনা দিলো স্বামী

প্রেমের জেরেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে জর্ডান প্রবাসী নারীকে কুপিয়ে হত্যা করেন স্বামী দুলাল হাওলাদার। গুম করতে লাশকে করা হয় চার টুকরো। তবে হত্যাকাণ্ডের শিকার শিরিন বেগমের প্রেমের বিষয়টি মানতে নারাজ পরিবার। তারা দুলালের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছে।

দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগ এলাকার খোরশেদ আলমের বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে চলতি মাসে উঠেছিলেন দুলাল হাওলাদার ও শিরিন বেগম দম্পতি। ওই বাসা থেকে জোরালো শব্দ পেয়ে সোমবার (১২ অক্টোবর) ভোরে ৯৯৯-এ কল করে যাত্রাবাড়ী থানায় সংবাদ দেন বাড়িওয়ালা। পরে পুলিশ এসে শিরিনকে শরীর থেকে মাথা ও দুই পা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পায়। সঙ্গে সঙ্গে আটক করা হয় দুলালকে।

শিরিনকে হত্যার ঘটনায় ছেলে সিরাজ হাওলাদার সোমবার যাত্রাবাড়ী থানায় বাবাকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার পর গ্রেফতার দেখিয়ে দুলালকে আদালতে হাজির করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। আসামি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আতিকুল ইসলাম।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলাম তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর তথ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন।

খুনের কারণ জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আতিকুল ইসলাম বলেন, শিরিন বেগম বিদেশে থাকতেন। দুই মাস আগে দেশে আসেন। দুলাল জানতে পারেন তার স্ত্রী অন্য লোকের সঙ্গে প্রেম করে। তাকে অনেকবার নিষেধ করলেও শোনেনি। ২-৩ দিন ধরে এটা নিয়ে ঝগড়া হয়। ঘটনার দিন রাতে ঝগড়ার একপর্যায়ে দুলাল তার স্ত্রীর চুল ধরে মেঝেতে আঘাত করে। এতে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। তবে আমার মনে হয় তখনই সে মারা গেছে। পরে বঁটি দিয়ে স্ত্রীর দেহ চার টুকরো করে। এমনটাই জানিয়েছে দুলাল।

তিনি বলেন, খুনের আগে শিরিনকে কিছু খাওয়ানো হয়েছে কিনা তার জন্য ভিসেরা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে। ওই রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এসআই আতিকুল ইসলাম। তবে দুলালের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তা মানতে নারাজ পরিবার।

দুলাল ও শিরিন দম্পতির ছেলে সিরাজ হাওলাদার বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সে নিজের দোষ ডাকতে কৌশলী হয়ে এমন কথা বলছে। আমার মায়ের কারও সঙ্গে এমন সম্পর্ক নেই। থাকলে তো উনি বিদেশ থেকে এসে যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, তার কাছেই যেতেন। আমাদের কাছে আসতেন না।

তার দাবি, বিদেশ থেকে আয় করা টাকা না দেওয়ায় তার বাবা মাকে খুন করেছে।

সিরাজ বলেন, আমরা দুই ভাই-বোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থাকি। আমার বাবা-মা আগে দয়াগঞ্জ এলাকায় ভাড়া থাকতো। সেখানে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। চলতি মাসে তারা দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে বাসা ভাড়া নেন। ওই বাসায় এখনও যাওয়া হয়নি।'

তিনি বলেন, থানা থেকে আমার বোনের হাজবেন্ডকে পুলিশ ফোন করে ঘটনা জানায়। পরে আমার বোনজামাই সকাল সাড়ে ৭টায় আমাকে খবর দেয়। আমি এসে মায়ের লাশ পাই।

সিরাজ বলেন, আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই মারামারি করতেন। আমাদের দাদা-দাদির তিনিই একমাত্র ছেলে। আর তাদের তিন জন মেয়ে আছে। প্রথমে তিনি আমার দাদিকে মারধর করেন। মারধরে অসুস্থ হয়ে দাদি মারা যান। দাদাকে মারধর করে এমন অবস্থা করেছে, তিনি উঠে দাঁড়াতে পারেন না। বোনদের মারধর করেছেন। দাদা বলতেছেন, প্রথম থেকে ওর বিচার করা হয়নি। বিচার করলে এ পর্যায়ে আসতো না। আমার মায়ের সঙ্গেও তার ঝামেলা ছিল। অভাব অনটনের কারণে মা জর্ডানে চলে যান। সে (বাবা) কোনও কাজ করতো না। একদিন সিএনজি চালালে সাত দিন বসে থাকতো। জুয়া খেলতো। আমাদের দুই ভাই-বোনের খরচ মা চালাতেন। বোনটার বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা আমাদের কোনও খরচ দিতো না। সব খরচ দিতেন মা।

তিনি বলেন, মা খরচ দিয়ে আমাকে ডিপ্লোমা কমপ্লিট করিয়েছে। বোনকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়িয়েছে। তাদের দুই জনের (বাবা-মা) মধ্যে সবসময় ঝামেলা ছিল। আমরা মিটিয়েও দিয়েছি কয়েকবার। কিন্তু বিষয়টা এ পর্যায়ে আসবে ধারণা ছিল না। আমরা বাবার বিচার চাই। আমার বোন বলেছে বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। দাদাও বিচার চায়। তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হোক।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিরিন বেগম দীর্ঘদিন ধরে জর্ডানে ছিলেন। শাশুড়ির মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে দুই বছর আগে দেশে আসেন। দেশে আসার পর থেকে দুলালের সঙ্গে শিরিনের বিভিন্ন বিষয় ও টাকা-পয়সা নিয়ে ঝামেলা হতো। শিরিনকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন দুলাল। বিষয়টি শিরিন ছেলে-মেয়েকে জানান।

বাসা থেকে জোরালো শব্দ পেয়ে সোমবার ভোরে ৯৯৯-এ কল করে যাত্রাবাড়ী থানায় সংবাদ দেন বাড়িওয়ালা খোরশেদ আলম। রাত ৩টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ বাড়িওয়ালাকে নিয়ে ওই বাসায় যায়। শিরিন বেগমের কথা জিজ্ঞাসা করলে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে দুলাল। সন্দেহ হলে বাসায় তল্লাশি করে পুলিশ। পরে রান্নাঘরের মেঝেতে শরীর থেকে মাথা এবং কোমরের নিচ থেকে দুই পা বিচ্ছিন্ন করা শিরিনের লাশ দেখতে পায় পুলিশ। সঙ্গে সঙ্গে দুলালকে আটক করে পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে দুলাল জানায়, রবিবার রাত ২টার দিকে মাথা মেঝেতে আঘাত করে শিরিনকে হত্যা করে সে। এরপর লাশ গুম করার জন্য চার টুকরো করে রান্নাঘরে লুকিয়ে রাখে।