গ্রেফতার হয় কিশোররা, ধরাছোঁয়ার বাইরে ‘বড়ভাইয়েরা’: কীভাবে ভাঙবে চক্র?

ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, বদলে যায় এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের সমীকরণ। কিন্তু পাড়া- মহল্লার অলিগলিতে অপরাধের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ‘বড়ভাই’ সংস্কৃতির অবসান ঘটে না। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের আড়ালে কখনও পুরোনো, কখনও নতুন পৃষ্ঠপোষকের ছত্রছায়ায় সংগঠিত হচ্ছে কিশোর গ্যাং। হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখলবাজি থেকে শুরু করে খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি দেখে প্রশ্ন উঠছে, এই গ্যাংগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? আর যাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোররা অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বিভাগীয় শহর থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও থামছে না তাদের দৌরাত্ম্য। বরং পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ১১৮ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৯টিতে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোর গ্যাং এখন আর শুধু বখে যাওয়া কয়েকজন কিশোরের দলবদ্ধ অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সহযোগী শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কখনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, কখনও জমি-বাড়ি দখল, আবার কখনও অফিস আদালতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে তাদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ জগতে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় কোথাও কোথাও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে এসব গ্যাংয়ের যোগাযোগের তথ্যও উঠে আসছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণেও পরিবর্তন এসেছে। তবে কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বন্ধ হয়নি। আগে যারা রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে কিশোরদের সংগঠিত করতেন, তাদের কেউ কেউ এখনও প্রভাব ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে কোথাও নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে সক্রিয় রয়েছে গ্যাং সদস্যরা।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অপরাধের দৃশ্যমান অংশে থাকলেও নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও অর্থদাতারা থেকে যান আড়ালে। ফলে মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও গ্যাং পরিচালনার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দৃশ্যমান হচ্ছে এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা। বিভিন্ন নামে সংগঠিত দলের সদস্যদের ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও চাপাতি, ছুরি, চাকু ও সামুরাই ধরনের অস্ত্র হাতে দলবদ্ধভাবে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিও জনমনে আতঙ্ক তৈরির পাশাপাশি অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারা দেশে ৩৮৬ গ্যাং, ঢাকায় তিন হাজারের বেশি সদস্য

পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তালিকাভুক্ত এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এরা কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত হলেও এসব অপরাধী গোষ্ঠীতে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় ১৫৯টি, চট্টগ্রামে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য এলাকাতেও রয়েছে এসব গ্যাংয়ের বিস্তার।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরের আটটি বিভাগে সক্রিয় ১৫৯টি গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গত বছর রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। এক বছরে নতুন করে ৪১টি গ্যাং যুক্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের অপরাধের ধরন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আগে পাড়া মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের নাম বেশি আসতো। এখন মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

কুমিল্লার হত্যাকাণ্ডে নতুন করে আলোচনায় গ্যাং কালচার

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসার পর নতুন করে আলোচনায় আসে গ্যাং কালচার। ঘটনাটি ঘিরে কিশোর অপরাধের বিস্তার, অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শুধু এই হত্যাকাণ্ড নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসছে। কোথাও সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, আবার কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করে অপরাধের বিস্তার ঠেকানো কঠিন। কারণ এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষক ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অক্ষত থাকলে নতুন সদস্য সংগ্রহ করে আবারও অপরাধের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার সুযোগ থেকে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের সমাজে মাসল পাওয়ারের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি বা বিভিন্ন অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ম্যানপাওয়ার লাগে। সেই ম্যানপাওয়ার অনেক সময় কিশোরদের দিয়ে তৈরি করা হয়। এখানেই তৈরি হয় ক্রিমিনাল পলিটিশিয়ান নেক্সাস।’’

অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘‘কোনও অপরাধী জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে অপরাধে টেনে নেওয়া হয়। প্রথমে তারা ছোটখাটো কাজ করে। যেমন- মাদক পৌঁছে দেওয়া, খবর দেওয়া, এলাকায় মহড়া দেওয়া, চাঁদা তোলা কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো। পরে ধীরে ধীরে বড় অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।’’

এই অপরাধচক্রের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তুলে ধরে অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, ‘‘যারা আজ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, তাদের একটি অংশই আগামী দিনে বড় গ্যাং লিডার বা সংঘবদ্ধ অপরাধী হয়ে ওঠে।’’ তিনি বলেন, ‘‘একজন কিশোর যখন দেখে কম ঝুঁকিতে বেশি লাভ, এলাকায় পরিচিতি, বড়ভাইদের সান্নিধ্য, অস্ত্র, মোটরসাইকেল ও অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, তখন তার কাছে অপরাধ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।’’

পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ পুলিশের

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘‘সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কিশোর গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি, গ্রেফতার করছি। এছাড়া এই অপরাধ নির্মূলে অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।’’

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সন্তান সন্ধ্যার পর বাসা থেকে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সে বিষয়ে বাবা মাকে সচেতন হতে হবে। অভিভাবক সচেতন হলে কিশোর অপরাধ আস্তে আস্তে কমে আসবে।’’

শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক আইনি সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তার মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিচার ও দণ্ড প্রক্রিয়ায় বিশেষ বিধান থাকায় কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় পরিবারকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবার থেকেই সুশিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করা জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।