মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়

‘সন্ধ্যায় এই সড়কে এলে মনে হয় ভুল করে বাজারে ঢুকে পড়েছি’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়। বিকাল হলেই মূল সড়কের ওপর সবজি, মাছ, ফলমূল থেকে শুরু করে জামাকাপড়ের পসরা নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যার পর মূল সড়কের ওপর বসতে শুরু করে ভাসমান দোকান পাশাপাশি সড়কের বিভিন্ন অংশে দাঁড়িয়ে যায় শত শত ভ্যানের উপর সাজানো পণ্য। দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে যান চলাচলের জায়গা। ফলে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে যানবাহনের চাপ।

সড়কের এক পাশজুড়ে বসে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক দোকানের হ্যান্ডমাইকের হাঁকডাকে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সড়কটি। এতে করে ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ এই সড়কটি ধরে গাড়ি চলাচলই কষ্টকর হয়ে ওঠে। একদিকে ভাসমান দোকান ও ভ্যান, অন্যদিকে ক্রেতা আর পথচারীদের ভিড়। সব মিলিয়ে ব্যস্ত এ পথ পরিণত হয় জানজটের ভোগান্তির জায়গায়। দিনের বেলায় যে পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় দুই মিনিট। সন্ধ্যার পর সেই পথ যেতে সময় লাগছে ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত।

বসিলা থেকে নিয়মিত যাতায়াত করা যাত্রী সাব্বির হোসেন বলছিলেন, ‘সন্ধ্যাবেলা এই সড়কে চলাচলের সময় মনে হয়, ভুল করে কোনো বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। শুরুর দিকে এই সড়কে মূলত এক সারিতে দোকান বসানো হতো। গাড়ির লেন অন্তত দুটি খালি থাকতো। এখন দিনদিন সেখানে তিন সারিতে দোকান বসছে। একটি লেনে কোনোরকম গাড়ি যাতায়াত করে।’

বিকাল হতেই শুরু হয় দোকান বসা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

অথচ এখানেই একাধিকবারই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবার দখল হয়ে যাচ্ছে ফুটপাত ও সড়ক। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এসব দোকান বসানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব।

এই দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে একটি সেলুন থেকে বের করে ফরহাদ নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর জের ধরে গতকাল ফরহাদের দুলাভাই সুমন আলী (৪৫) ও তার ছেলে ফাহিমকে ছুরিকাঘাতে আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাশেই পাইকারি আড়ত থাকা সত্ত্বেও চাঁদা আদায় ও অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলেও এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ফুটপাত ও সড়ক দখল

মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ তিন রাস্তা এলাকায় ফুটপাত ও সড়কে ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিটা দোকান থেকে তোলা হয় চাঁদা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে তিনরাস্তা এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হতো। এখন হাতবদল হয়েছে, বেড়েছে চাঁদার পরিমাণও। চার-পাঁচটি গ্রুপ জায়গা ভাগ করে চাঁদা আদায় করছে। আগের কমিশনারের ছেলেপেলেও এর সঙ্গে যুক্ত।’

তিন রাস্তার মোড়ের শিকদার সুজের দোকানদার আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন রাস্তার মোড়ে ময়ূর ভিলার সামনে ও আশপাশে ফুটপাতের বিভিন্ন অংশে দোকান বসানোর জন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত ৩০০-৪০০ টাকা আদায় করা হয়। জায়গার অবস্থান অনুযায়ী টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এই টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে গতকাল গোলাগুলি হয়েছে।’

স্থানীয় রিকশাচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত ১৭ বছর একদল খেয়ে গেছে। এখন আরেকদল খাচ্ছে। তাদের খাওয়া দাওয়াকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় প্রায় মারামারি হয়। সিটি করপোরেশন একবার উচ্ছেদ করে আবার ওরা দখল করে। এভাবেই দিনপার হচ্ছে। আমরা রিকশা চালাই, আমাদের থেকেও চাঁদা চায়। রিকশায় উঠে ভাড়া দিতে চায় না। বলে আমরা ওমুক ভাইয়ের লোক, তমুক ভাইয়ের কাছের ছোট ভাই।’

চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা

চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জিলানী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘কোনো চাঁদাবাজ বা দখলদারদের ঠিকানা স্বেচ্ছাসেবক দলে হবে না। চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে আমরা অনেক আগেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। আমাদের দলের কেউ যদি এমন নীতিবহির্ভূত ঘটনায় জড়িত থাকে, তাহলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকালের ঘটনার পর পুরো রাস্তা পরিষ্কার করে (উচ্ছেদ করা হয়েছে) দেওয়া হয়েছে। আমরা ক্লিয়ার করি, পরক্ষণে আবার রাজনৈতিক প্রভাবে দোকানপাট বসানো হয়। মূলত একমাস আগে কেরানীগঞ্জে যে ছেলেটা মারা গিয়েছে, ওই ছেলের আপন দুলাভাই এবং ভাগনের ওপর গতকাল হামলা করা হয়েছে। গতকালের ঘটনাটা চাঁদাবাজি না, পূর্বের শত্রুতার জের ধরেই আবার পরিকল্পিত হামলা।’

ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আবার অভিযান

মিরপুর-১০-এর মতো মোহাম্মদপুর এলাকাতেও পুরোপুরি ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত চাই। বিশেষ করে উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন যেসব এলাকা রয়েছে, আমরা কিন্তু বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি।’

ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘আমরা মিরপুর ১০-এ ৩-৪ বার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। এখন কিন্তু সেই এলাকায় কোনো দখলদার নেই। সেখানকার বাসিন্দারা, পথচারীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছেন। তেমনি মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তা এলাকাতেও কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু এখন বারবার ফুটপাত দখল হয়ে গিয়েছে। আবারও অভিযান পরিচালনা করবো। এখন যেহেতু পূজার সময়, তাই উচ্ছেদ অভিযান শিথিল রয়েছে। পূজা শেষ হতেই ফের অভিযান চালানো হবে।’

ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর আবার দখল হয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জড়িত। প্রত্যেক জায়গায় দুই-তিনটি গ্রুপ আছে। এসব গ্রুপের রেষারেষি ও চাঁদার দ্বন্দ্বে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটে। তবুও তারা চেষ্টা করছেন।

মোহাম্মদপুরে বাবা-ছেলেকে আহত করার ঘটনা যেখানে ঘটেছে, সেখানে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি। ডিএনসিসি প্রশাসকের ভাষ্য, সেখানকার ফুটপাতের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কমিটি গঠন করে তাদের অন্যত্র জায়গা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু তারা রাজি হননি।