বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের অস্বাভাবিক প্রাণঘাতী বিস্তার, জিনগত পরিবর্তন এবং এর পেছনে কোনও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা অপশক্তির গোপন জৈব অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগের আশঙ্কা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের বৈজ্ঞানিক তদন্ত এবং দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বায়োলজিক্যাল ওয়েপন প্রিভেন্টিভ রিসার্চ ল্যাবরেটরি (জৈব অস্ত্র প্রতিরোধ গবেষণাগার) স্থাপনের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এই নোটিশটি প্রেরণ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বরাবর এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নোটিশের অনুলিপি জাতিসংঘের বাংলাদেশস্থ আবাসিক সমন্বয়কারীর কাছেও প্রেরণ করা হয়েছে।
আইনি নোটিশে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে বলা হয়, ডেঙ্গু জ্বর এখন আর কোনও সাধারণ রোগ নয়, বরং বাংলাদেশে এটি একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। নিয়মিত বিরতিতে নাগরিকদের প্রাণহানি এবং প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি কেবল মশার স্বাভাবিক বিস্তার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনজীবী এবং মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ কোর্সের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নোটিশদাতা আন্তর্জাতিক সামরিক বিজ্ঞান, জৈব সন্ত্রাস ও চিকিৎসা গবেষণার প্রামাণ্য নথিপত্র উদ্ধৃত করে তুলে ধরেন যে, সামরিক ইতিহাসে ডেঙ্গুকে জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট বাস্তব নজির রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জাপানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন পিএক্স’ নামে একটি সুপরিকল্পিত গোপন জৈব হামলার নীলনকশা চূড়ান্ত করেছিল, যা প্রখ্যাত গবেষক বেঞ্জামিন সি. গ্যারেট ও জন হার্টের ‘দ্য এ টু জেড অব নিউক্লিয়ার, বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ (২০১৯) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। সেই পরিকল্পনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ডেঙ্গু, প্লেগ, কলেরা ও টাইফাস জীবাণুবাহী মশা ও কীটপতঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে মহামারি সৃষ্টির কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া বিশিষ্ট বিষতত্ত্ববিদ অ্যান্থনি তুর কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস অ্যান্ড টেররিজম (২০১৮) গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে যে, মার্কিন সেনাবাহিনীর জৈব এজেন্টের তালিকায় ডেঙ্গু জ্বর ভাইরাসকে ‘ভাইরাস ভি-৩’ কোডে একটি যুদ্ধোপযোগী জীবাণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি রোনাল্ড জে. কেন্ডালসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণামূলক গ্রন্থ অ্যাডভান্সেস ইন বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল টেররিজম কাউন্টারমেজার্স (২০০৮) অনুযায়ী, মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ডেঙ্গুকে ‘ক্যাটাগরি-এ থ্রেট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যা জৈব সন্ত্রাসে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হিসেবে বিবেচিত।
নোটিশে আরও তুলে ধরা হয়, বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং মশার উপস্থিতিও ব্যাপক। ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক প্রাণঘাতী রূপ ও মৃত্যুহার দেখে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দৃঢ় সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যে, কোনও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী চক্র বাংলাদেশকে জৈব অস্ত্রের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না অথবা পতঙ্গের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে ল্যাবরেটরিতে তৈরি অতিরিক্ত শক্তিশালী কোনো ডেঙ্গু স্ট্রেন ছড়িয়ে দিচ্ছে কি না। এটি কেবল নিয়মিত মশা নিধনের বিষয় নয় বরং ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য, উৎস ও সংক্রমণপ্রক্রিয়া পর্যালোচনায় রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরোলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের দিয়ে জরুরি বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনা করা অপরিহার্য।
মো. মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের আন্তর্জাতিক বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস কনভেনশন (বিডাব্লিউসি)-এর অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। এই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১(১) ও অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী প্রতিটি সদস্য দেশের নিজেদের সুরক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধের স্বার্থে জৈব অস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক গবেষণাগার স্থাপন ও গবেষণার আইনগত অধিকার স্বীকৃত। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৪০ (২০০৪) রেজুলেশন অনুযায়ী জৈব অস্ত্রের বিস্তার ও অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের জীবনের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আইনি নোটিশে আগামী ১০ দিনের মধ্যে বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনগত ও ফরেনসিক তদন্ত সম্পন্ন করে তা কোনও কৃত্রিম জৈব আক্রমণ কি না তা নির্ধারণ করা, অবিলম্বে উচ্চ সুরক্ষাসম্পন্ন বায়োলজিক্যাল ওয়েপন প্রিভেন্টিভ রিসার্চ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা এবং এডিস মশা নিধনে বিজ্ঞানসম্মত সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায়, জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিকদের জীবন রক্ষার স্বার্থে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে।