সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা, তদন্ত নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন

ঢাকার সাভারে ভাড়া বাসায় অবস্থান করছিলেন সাংবাদিক সিফাত মাহমুদ ফাহিম। অথচ চাঁদাবাজির একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সময় তাকে নওগাঁর আত্রাইয়ের একটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে উপস্থিত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। তদন্তে অনিয়ম ও সাক্ষীদের বক্তব্যে অসংগতির অভিযোগ তুলে মামলাটি পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ফাহিমের পরিবারের সদস্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ফাহিমের বাবা ওসমান আলী প্রামানিক, মা শেফালী বেগম, ভাই ফিরোজ প্রামানিক ও খালাতো ভাই নাজমুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দৈনিক ইনকিলাবের নওগাঁর আত্রাই প্রতিনিধি ফাহিমের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন উপজেলার ২ নম্বর ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন মণ্ডল। গত ৩ জুন আত্রাইয়ের ৮ নম্বর আমলি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করা হয়।

পরিবারের দাবি, তদন্ত শেষে ফাহিমের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৮৫ ও ৫০০ ধারায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। গত ১৪ অক্টোবর নওগাঁর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন ফাহিম। তবে বিচারক মো. নজরুল ইসলাম তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পরিবারের অভিযোগ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আত্রাই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সেলিমুজ্জামান তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সময় ফাহিমের অবস্থান ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে দেখিয়েছেন। অথচ ওই দিন তিনি ঢাকার সাভারে নিজের ভাড়া বাসায় ছিলেন। ঘটনার সময় ও স্থানে তার উপস্থিতি কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।

তাদের আরও অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনে গ্রাম পুলিশ মো. আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ করা হলেও এ বিষয়ে তার সঙ্গে কেউ কথা বলতে যাননি বলে তিনি দাবি করেছেন। এ বক্তব্যের একটি রেকর্ডিং তাদের কাছে রয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

মামলার দুই সাক্ষী মো. সবুজ হোসেন ও মো. শহিদুল ইসলাম হলফনামার মাধ্যমে এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছে পরিবার। অন্য সাক্ষী মো. আল আমিন খাঁ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

পরিবারের ভাষ্য, তদন্ত কর্মকর্তা কী কী প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, কীভাবে সাক্ষীদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন, ঘটনার সময় ও স্থান কীভাবে যাচাই করেছেন এবং ফাহিমের পক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনায় নিয়েছেন কি না—এসব বিষয় মামলার নথি ও কেস ডায়েরি পর্যালোচনা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

সংবাদ প্রকাশের জেরে মামলার অভিযোগ পরিবারের

ফাহিমের পরিবারের অভিযোগ, ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ফাহিমকে চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি মালামাল সরিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে নেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে দৈনিক ইনকিলাবে ‘আত্রাইয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ সরানোর অভিযোগ, ডিসিকে ইউএনওর চিঠি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

পরিবারের দাবি, গত ১২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ মামলায় চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন মণ্ডল গ্রেফতার হওয়ার খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দৈনিক ইনকিলাবেও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এর আগে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ফাহিমসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

এসব প্রতিবেদনের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে চেয়ারম্যান ফাহিমের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে অভিযোগ পরিবারের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।

পরিবারের পক্ষ থেকে মামলাটির নিরপেক্ষ পুনঃতদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাদী জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন—তদন্তে এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

ফাহিমের ন্যায়বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে পরিবারের সদস্যরা বলেন, মামলার অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ঘটনার সময় ও স্থানের তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।