অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী অভিযান চালালে পুলিশ কী করবে 

মাদকবিরোধী অভিযানের দায়িত্ব পুলিশের। অপরাধী শনাক্ত, গ্রেফতার, তল্লাশি এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সেই অভিযানে যখন একজন প্রতিমন্ত্রী নিজেই পিস্তল হাতে লোকজনকে তাড়া করেন, অস্ত্র তাক করে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন— তখন পুলিশের ভূমিকা কী হবে? পুলিশ কি তার সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে,নাকি আইনের সীমা অতিক্রম করা হলে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে? রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও প্রকাশের পর এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে। একইসঙ্গে আলোচনায় এসেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতার বিষয়টিও।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, এক হাতে হ্যান্ডমাইক, অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে কয়েকজনকে তাড়া করছেন তিনি। একপর্যায়ে পিস্তলের স্লাইড টেনে অস্ত্র তাক করে তাদের দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতেও দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা গেছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, একজন জনপ্রতিনিধি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, কিন্তু তিনি কি নিজেই অস্ত্র হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো অভিযান পরিচালনা করতে পারেন? ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স কি তাকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করার অধিকার দেয়?

পুলিশ কী বলছে

রবিবার (১৮ অক্টোবর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে একটি সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান, অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘এখনই এটা মূল্যায়নের সময় আসেনি। যেটা আপনারা দেখেছেন, সেটা আমরাও দেখেছি। স্থানীয় ডিসিকে বলা হয়েছে, তিনি স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে একটা রিপোর্ট দেবেন। যদি কোনও আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকে, তবে পুলিশ অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’’

একজন এমপি কিংবা প্রতিমন্ত্রী পুলিশের মতো অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন ডিবিপ্রধান।

তার এই অবস্থান নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় পুলিশের করণীয় নির্ধারণে কী, শুধু প্রশাসনিক প্রতিবেদনের অপেক্ষাই যথেষ্ট? নাকি ভিডিওতে দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড এবং প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া ব্যাখ্যা মিলিয়ে আইনগত বিষয়গুলো দ্রুত যাচাই করা?

লাইসেন্স থাকলেই কি অস্ত্র তাক করা যায়?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’-এর ২৫(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন বা ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি হয়, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবেন না।’

অর্থাৎ অস্ত্রের বৈধ মালিকানা এবং সেই অস্ত্র ব্যবহারের বৈধতা দুটি পৃথক বিষয়। দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০২ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হলেও তার সীমা নির্ধারিত রয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষতিসাধনের সুযোগ নেই। ফলে ঘটনাস্থলে প্রকৃত হামলার আশঙ্কা কতটা ছিল এবং অস্ত্র তাক করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কিনা, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, দণ্ডবিধির ৫০৩ ধারায় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কাউকে ক্ষতির ভয় দেখানো অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের আওতায় পড়তে পারে। ইশরাক হোসেনের ঘটনায় এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা, তা তদন্ত ও প্রমাণসাপেক্ষ বলে মনে করেন কেউ কেউ।

আত্মরক্ষার দাবি প্রতিমন্ত্রীর

রবিবার দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, তার হাতে থাকা পিস্তলটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে তিনি ও তার নিরাপত্তারক্ষীরা সাময়িকভাবে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন।

প্রতিমন্ত্রীর দাবি, আগে থেকেই মাদক কারবারিদের হামলা ও গুলিবর্ষণের আশঙ্কার বিষয়ে সতর্কবার্তা ছিল। তার উদ্যোগে স্থানীয় থানা পুলিশের সহযোগিতায় চার-পাঁচটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আগেও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। গণমাধ্যমে ঘটনার খণ্ডিত চিত্র উপস্থাপনের অভিযোগও করেছেন তিনি।

জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব কতটুকু, পুলিশের শুরু কোথায়?

পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধী শনাক্ত এবং আইনগতভাবে গ্রেফতারের দায়িত্ব পুলিশের। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারায় সাধারণ নাগরিকেরও কিছু পরিস্থিতিতে অপরাধী আটকের সীমিত সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বিধান কাউকে নিয়মিত পুলিশি অভিযান পরিচালনা, কিংবা নির্বিচারে বলপ্রয়োগের ক্ষমতা দেয় না।

একজন প্রতিমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রশাসনকে নির্দেশনা দিতে, সমন্বয় করতে এবং জনসচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত অস্ত্র হাতে সন্দেহভাজনদের ধাওয়া করা— তার দাফতরিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কিনা, সেটিই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা চলছে।

এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বও দ্বিমুখী। একদিকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যদিকে অভিযানে অংশগ্রহণকারী যে কারও সম্ভাব্য আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।

ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের শর্ত। লাইসেন্সে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে— কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। আমার দৃষ্টিতে তিনি যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তাতে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।’’

পুলিশের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘এ ক্ষেত্রে পুলিশের সরাসরি করণীয় তেমন কিছু নেই। বিষয়টি মূলত অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। তিনি যদি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।’’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। একজন সংসদ সদস্য কিংবা প্রতিমন্ত্রী মাদক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন, প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু নিজে অস্ত্র হাতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধাওয়া করা, কিংবা অস্ত্র তাক করে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই যেকোনও পরিস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শনের অধিকার তৈরি হয় না। আত্মরক্ষার যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে হলে— সেখানে বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল কিনা, সেটি নিরপেক্ষ তদন্তে নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আইনের প্রয়োগে সাধারণ নাগরিক ও একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের মধ্যে কোনও বৈষম্য থাকতে পারে না। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তৃত্ব, পেশাদারত্ব এবং আইনের শাসন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হবে।