মাদক সেবন ও কারবারে জড়াচ্ছে পুলিশ, নিয়ন্ত্রণ করবে কে? 

যাদের হাতে মাদক নির্মূলের দায়িত্ব, তাদেরই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন মাদক সেবন, পাচার ও কারবারে। মাদক মামলার আলামত সংরক্ষণ ও ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হচ্ছেন ইয়াবাসহ। মাদক কারবারের অভিযোগ উঠছে থানায় কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যের বিরুদ্ধে। ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক দমনের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরাই যদি কারবারে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণ হবে কীভাবে?

গত কয়েক মাসে ঢাকা, রংপুর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নাটোর, বগুড়া, বরিশাল ও কিশোরগঞ্জে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ইয়াবা পরিবহন ও বিক্রির অভিযোগে গ্রেফতার, কোথাও মাদক সেবনের আসরে আটক, আবার কোথাও ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সদস্যদের সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং জব্দ মাদকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত সদস্যদের একাংশের অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তা পুরো কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু গ্রেফতার কিংবা চাকরিচ্যুতি নয়, প্রয়োজন অপরাধচক্রের নেপথ্যের যোগাযোগ শনাক্ত করা এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

একের পর এক ঘটনায় পুলিশের নাম

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রংপুর নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার স্কাইভিউ হোটেলের সপ্তম তলার ৭১০ নম্বর কক্ষে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সেখান থেকে ১৯ পিস ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ রংপুর জেলা পুলিশের কনস্টেবল মিঠুন ইসলাম (২৯) এবং সাবেক কনস্টেবল ওমর আলীকে (৩৭) গ্রেফতার করা হয়।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা বাইপাস এলাকায় ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপসহ দুই পুলিশ কনস্টেবল মোস্তাইন বিল্লাহ ও নাজমুল ইসলামকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই মাসের ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে গ্রেফতার করে বিজিবি। তার কাছ থেকে মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়।

চট্টগ্রামে ৫ মে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার পথে খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন। এর চার দিন আগে ১ মে রামুতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ ৮ এপিবিএনের কনস্টেবল সজিব ব্যাপারীকে আটক করে বিজিবি।

২০২৫ সালের ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল মনিরুল ইসলামও ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন। কক্সবাজার থেকে মোটরসাইকেলে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে তাকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে মামলা করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুরে ১ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন কনস্টেবল মো. রেজাউল করিম। তিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আলামত নিষ্পত্তি ও মাদক ধ্বংসসংক্রান্ত শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। একটি খাবারের দোকানে ইয়াবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অবস্থানের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার পর আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল দাবি করেন, ইয়াবা তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়নি, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই পড়ে ছিল।

২৪ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণখানে মাদক কারবারের অভিযোগে পল্লবী থানার এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগী ওয়াসিম গ্রেফতার হন। পুলিশ জানায়, প্রথমে ওয়াসিমের কাছ থেকে ৫০ পিস, পরে শফিকুলের কাছ থেকে ২০০ পিস এবং আরেকটি ফ্ল্যাট থেকে ৫ হাজার ১১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।

শফিকুলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও ছিল। পল্লবী থানার তৎকালীন ওসি জানান, জুনেই তার অনুপস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল। এরপরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে ২৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুরে ১০৬ পিস ইয়াবাসহ রাজশাহী রেঞ্জের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল আল আমিনসহ তিনজন গ্রেফতার হন। তাদের কাছ থেকে দুটি মোটরসাইকেল ও নগদ ৩২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। মাদক বিক্রি ও পরিবহনের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

২৩ মে বগুড়ার তিনমাথা রেলগেট এলাকায় ক্রেতা সেজে অভিযান চালিয়ে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ সাইদুর রহমান ও আব্দুল ওয়াহাবকে আটক করে ডিবি। সাইদুর জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সদস্য হলেও প্রায় দুই মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। আব্দুল ওয়াহাব চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে বাসা ভাড়া নিয়ে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে।

৮ অক্টোবর বরিশালের দক্ষিণ কড়াপুর এলাকায় মাদক সেবনের আসরে অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দর থানার এএসআই দেলোয়ার হোসেনসহ চারজনকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম মিললেও মাদক পাওয়া যায়নি। অভিযানের সময় দেলোয়ার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে থানায় হস্তান্তরের পর ওসি দাবি করেন, তিনি ছুটিতে ছিলেন। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার তথ্য পাওয়া যায়।

একই অভিযানে আটক অন্য দুজনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় ২০ দিনের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু দেলোয়ারের ডোপ টেস্ট হয়েছিল কিনা, তা স্পষ্ট নয়। ফলে সাধারণ নাগরিক ও পুলিশ সদস্যের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার সমান প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ডোপ টেস্টে ১২৬ জন শনাক্ত, চাকরিচ্যুত ১১৬

পুলিশের অভ্যন্তরে মাদকসম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে ডোপ টেস্টের পরিসংখ্যানেও। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত ১২৬ জন সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়। তাদের মধ্যে ১১৬ জন চাকরিচ্যুত হন। শনাক্তদের ৯৮ জন কনস্টেবল, ১১ জন এসআই, সাতজন এএসআই, আটজন নায়েক, একজন পরিদর্শক ও একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, ২০২৫ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত আরও ১৭ সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন কনস্টেবল, একজন এএসআই ও একজন নায়েক। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিন ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হন। তার নমুনায় বেনজোডায়াজেপিনস ও অ্যামফিটামিন বা মেথঅ্যামফিটামিন শ্রেণির উপাদান শনাক্ত হওয়ার কথা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের চালক কনস্টেবল ওসমান গনির ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সেখানকার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছেন

মাদকের বিস্তারে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেছেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘পুলিশের কিছু বিপথগামী সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকে। আমাদের লোকজনের সম্পৃক্ততা না থাকলে মাদক কারবারিরা এতটা সুযোগ পেতো না। তবে সবাই এমন নয়। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে। আমরা সব সময়ই বলি, আমাদের কোনও সদস্য যেন এসব কর্মকাণ্ডের অংশ না হন।’’

তিনি বলেন, ‘‘মাদকের বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। তদন্ত বা অনুসন্ধানে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’’

ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে এই অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘‘চাইলেই যখন তখন যেকোনও সদস্যের ডোপ টেস্ট করানো যায় না। কাউকে দৃশ্যত মাদকাসক্ত অবস্থায় না দেখলে পরীক্ষা করানো কঠিন। এটি ব্যয়বহুলও। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। আগে ডোপ টেস্টের পর চাকরিচ্যুত সদস্যদের কেউ কেউ আদালতে গেছেন। তাই অহরহ পরীক্ষা করা হয় না।’’

‘পুলিশ সদস্য হলেও ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার সদস্যের বিশাল পুলিশ বাহিনীতে কিছু বিপথগামী ব্যক্তি থাকতেই পারেন। সবাই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে কেউ ছাড় পাবেন, এমন সুযোগ নেই।’’

ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে অনেকেই ডোপ টেস্ট করাচ্ছেন। চালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা হচ্ছে। সন্দেহ হলে নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে। আগামী এক-দুই বছরে এর পরিধি আরও বাড়বে।’’

তিনি জানান, পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। চালকের ক্ষেত্রে চাকরি পাওয়া বা বহাল থাকার বিষয়ে ব্যবস্থা হতে পারে। ডোপ টেস্টের বর্তমান জটিলতা আগামী দুই বছরের মধ্যে আরও সহজ হবে বলেও আশা করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে মাদক সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লাখ লাখ টাকার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়াচ্ছেন। প্রথমেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু যারা প্রতিরোধের সামনের সারিতে, তারাই জড়িয়ে পড়লে সরকারের উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা প্রশ্নের মুখে পড়বে।’’

তিনি বলেন, ‘‘মাদক নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরদারি, পরীক্ষা নিরীক্ষা ও প্রয়োজনে নিয়মিত ডোপ টেস্ট করতে হবে। কেউ মাদক কারবারিদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিলে কিংবা অপরাধে জড়ালে তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’’

অধ্যাপক রেজাউল করিম আরও বলেন, ‘‘মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর নৈতিক অবস্থান, স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে হবে। অপরাধীদের ধরা পড়া ও শাস্তির ঝুঁকি বাড়াতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের নৈতিকভাবে দৃঢ়, সৎ ও সক্রিয় হতে হবে। তা না হলে কার্যকর ও টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন।’’