সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আইনে আর্থিক সহায়তার বিধান থাকলেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেতে তাই অনেক ভুক্তভোগীকে দ্বারস্থ হতে হচ্ছে উচ্চ আদালতের। এতে সামনে আসছে ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়ীপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দিতে তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫ লাখ টাকা, গুরুতর অঙ্গহানির ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা এবং নির্দিষ্ট ধরনের আহত ব্যক্তিকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চিকিৎসাব্যয়, উপার্জন ক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির তুলনায় এই অর্থ কতটা পর্যাপ্ত, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ৩১ হাজার ৯০৪ জনের বিপরীতে মাত্র ১ হাজার ৪৭১ জন ভুক্তভোগী বা তাদের স্বজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ সময়ে বিতরণ করা হয়েছে ৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তের হার ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, সময়ের বাধা
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনপ্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে না পারাকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এসব জটিলতার কারণে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে উঠে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়।
ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রশ্নে ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল ও ট্রাস্ট গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে রুল জারি করেন। এতে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার আইনি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের গুরুত্ব সামনে আসে।
তবে আর্থিক সহায়তার বিধান থাকা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ এবং ক্ষতির তুলনায় নির্ধারিত অর্থ কতটা যথাযথ; এসব প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ক্ষতিপূরণ পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতাও সেই বাস্তবতাকে সামনে আনছে।
অধস্তন আদালতে টর্ট আইনের চর্চা বাড়ানোর তাগিদ
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অধস্তন আদালতে টর্ট আইনের তেমন প্র্যাকটিস নেই, এটাকে বাড়াতে হবে। তাহলে আর ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়েরের দরকার হবে না। সিভিল মামলার মাধ্যমেই অবহেলা ও দুর্ঘটনার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন ভুক্তভোগীরা। উন্নত রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়টিকে অনেকটাই কার্যকর করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটা নেই।’
তিনি আরও বলেন, অধস্তন আদালতে এসব মামলায় রায় পেতে অনেক বেগ পেতে হয়। বিবাদীদের প্রতি সমনের নোটিশ জারি, জবাব দাখিল, বিচারিক বিষয় গঠন, সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের বিস্তারিত কার্যক্রম শেষ করতেই বছরের পর বছর লেগে যায়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেওয়ানি কার্যবিধি আইন সংশোধন করে দ্রুত বিচার বা ফাস্ট ট্র্যাক পদ্ধতি চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলার সার্বিক কার্যক্রম শেষ করার বিধান রাখা যেতে পারে। সেই সময়সীমা হতে পারে ছয় মাস বা সর্বোচ্চ এক বছর।
ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, ‘তাহলে আর ক্ষতিপূরণের প্রত্যাশায় হাইকোর্টে রিট দায়েরের প্রবণতা হ্রাস পাবে। কেননা, অধস্তন আদালতে সুযোগ থাকলেও এখানে (হাইকোর্টে) সাক্ষীর জবানবন্দি, জেরা প্রভৃতির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করাটা কঠিন হয়ে যায়।’
ক্ষতিপূরণের মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নজির
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্টে কয়েকটি মামলা গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে আছে। চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ মামলা এবং গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় পা হারানো রাসেল সরকারের মামলা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
রাসেল সরকারের ঘটনায় হাইকোর্ট পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এসব মামলা সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তবে রাসেল সরকার ক্ষতিপূরণের কিছু অংশ পেলেও তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ধলেশ্বরী টোল প্লাজার দুর্ঘটনায় নিহত ছয়জনের প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় কোটি টাকা এবং আহত পাঁচজনকে প্রত্যেককে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট।
বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বারবার উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা তাই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ক্ষতিপূরণের বিধান যুগোপযোগী করার দাবি
আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম আল ফেসানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রচলিত আইনে যে ক্ষতিপূরণের বিধান আছে, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে মোটেও যৌক্তিক নয়। তাই ওই বিধানের বাইরে গিয়েও আদালত ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা গ্রিন লাইন পরিবহনকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা আদেশের বিষয়টিও দেখতে পারি।’
এই আইনজীবী মনে করেন, এখন সময় এসেছে আইনকে যুগোপযোগী করে ক্ষতিপূরণের দায় নির্ধারণ করার। তার মতে, একটি সরকার তাদের সময়কার প্রেক্ষাপটে আইনটিতে ক্ষতিপূরণের সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তাই এটিকে সরকারের ব্যর্থতা বলা যাবে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় আইনের পরিবর্তনও জরুরি হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আইনে নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ বেঁধে না দিয়ে সামগ্রিকভাবে দুর্ঘটনার ধরন, পরিবহন মালিক বা দায়ী ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বিবেচনাধীন বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিধানগুলো সংশোধন করা দরকার।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তার বিধান থাকলেও সীমিত ক্ষতিপূরণ, আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। ক্ষতিপূরণের বিধান যুগোপযোগী করা এবং অধস্তন আদালতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি তাই সামনে আসছে। এতে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ কতটা সহজ হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।