জুলাই আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার তিন মামলায় হাসিনাসহ ১১৬ জন অভিযুক্ত

জুলাই আন্দোলনে দুই হত্যা ও একটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪০০ জনের বেশি আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলাগুলোর তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ। তদন্তে ১১৬ জনের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩০৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তিন মামলাতেই অভিযুক্ত হয়েছেন শেখ হাসিনা। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম তিন মামলার অভিযোগপত্রেই রয়েছে।

ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন হত্যা মামলা 

জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট মোহাম্মদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান ইলিয়াস হোসেন। পাঁচ দিন চিকিৎসা নিয়ে পরে মারা যান। এ ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১০২ জনকে আসামি করে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৪৩ জনকে অভিযুক্ত করে এবং ৬৬ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই আক্কেল আলী। তিনি বলেন, অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

শেখ হাসিনা সঙ্গে অভিযুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন তার বোন শেখ রেহানা, ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নুর তাপস, তার ভাই যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, আওয়ামী লীগের প্রসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, তার পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাবেক সংসদ সদস্য আ.কা.ম সরওয়ার জাহান বাদশা।

আরও রয়েছেন, পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজীব।

অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, রফিকুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, ফারুক, রতন, অভি খান, রীয়াজ মীর ও তার ভাই খোকন মীর, রনি বেপারী।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে আগামী ১৬ নভেম্বর মামলার শুনানি হবে। 

ছাত্রলীগের মার খেয়ে এলাকা ছাড়েন, ফেরেন লাশ হয়ে

মহসিন খান বলেন, ‌‌‌‌‌‌‘জুলাই আন্দোলনের আগে ২০২৪ সালের ২৪ জুন ছাত্রলীগ মারধরর করে আহত করে। এর সপ্তাহ খানেক আগে দোকানের মাল-জিনিস কেনার জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা লোন তোলে ইলিয়াস। দিদার বাহিনী সেই টাকা নিয়ে যায়। কাউকে এ কথা বললে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে তারা আমার ভাইকে মারছে, আমাকেও মেরেছে। চার দিন বরিশাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ২৮ জুন ও ঢাকায় চলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতি করার কারণে সে মার খেয়েছে। এ জন্য আমার সঙ্গে অভিমান করে কথা বলতো না। ২ অগাস্ট ওর আর আমার লাস্ট কথা হয়। ও ঢাকায় নয়ন নামে একটা ছেলের সঙ্গে কাজ করতো। নয়ন ফোন করে আমাকে জানায়, ইলিয়াসের শরীরে রাবার বুলেট লেগেছে। ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে। আমি ফোন দেয়, ফোন ধরে না। পরে ওই আমাকে ফোন করে। বাড়ি চলে আসতে বলি। বলে, বাড়ি গেলে ছাত্রলীগের পোলাপাইন তাকে আবার মারবে। আন্দোলনে গেছে এ জন্য। ৪ অগাস্ট আবার ওকে গুলি করে। প্রথমে ওরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে।’

মহসিন বলেন, ‘৬ তারিখ আমরা ঢাকা যায়। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আর কথা হয়নি। ৯ অগাস্ট সে মারা যায়। ভাই হত্যার বিচার চায়। তবে যারা হত্যার সঙ্গ জড়িত তাদের যদি অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তা মানবো না।’ 

ইলিয়াসের দুলাভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলা করেছি বিচারের জন্য। আমরা বিচার চায়।’

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গুলিবর্ষণ করতে থাকে। গুলিবিদ্ধ হন ইলিয়াসও। তাকে উদ্ধার করে মিরপুর নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৯ অগাস্ট মারা যান ইলিয়াস। এ ঘটনায় ইলিয়াসের বাবা ফারুক খান ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ১০২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন।

রায়হান আকন হত্যা

জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট বাড্ডার ইউলুপে গুলিবিদ্ধ হন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস বনশ্রী শাখার লোডার রায়হান আকন। এ ঘটনায় তার বাবার করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই সুমন মিয়া গত ২৭ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৪৯ জনকে অভিযুক্ত করে এবং ২৩৫ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।

এসআই সুমন মিয়া বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে গত মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি।’

শেখ হাসিনার সঙ্গে অভিযুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ওরফে শেখ সেলিম, পিরোজপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামিম শাহনেওয়াজ, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রবিউল ইসলাম ওরফে সোহেল।

অব্যাহতি পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান খান, এস এলাহী শিমুল, মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন ঢালী, আজম খসরু ও  কামাল হোসেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই কামাল উদ্দীন বলেন, ‘ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে রবিবার মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।’

মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ পরিবারের

এলাকার লোকদের মামলায় আসামি করে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছে রায়হানের পরিবার। তার চাচাতো ভাই আরিফুল ইসলাম কামরুল বলেন, ‘আমার চাচা সহজ-সরল মানুষ। কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রায়হান গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আমাকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতে বলেন। তার লাশ আমি বাড়িতে নিয়ে যায়। সবকিছুই তিনি আমার সঙ্গে আলাপ করেন। কিন্তু এলাকার কিছু লোক, একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। তারা চাচাকে ভুল-ভাল বুঝিয়ে ঢাকা নিয়ে এসে মামলাটা করিয়েছে। যারা তাকে ভুল-ভাল বুঝিয়েছে, পরে তারা মামলা বাণিজ্য করেছে। তাকে বোঝানো হয়, মামলা করলে তারা ছেলের নাম গেজেটভুক্ত হবে। পরে তিনি আমার কাছে এটা বলেছেন।’

কামরুল বলেন, ‘আমার চাচা মামলা করতে যাবে কীসের জন্য। মারছে তো পুলিশ। কার বিরুদ্ধে মামলা করবে। এমন কোনও ইনটেনশন ছিল না তার। মামলা করলে তো আর তার ছেলে ফিরে আসবে না। আর মামলায় অনেক অসহায়, নিরীহ লোককে ফাঁসানো হয়েছে। চাচা চাচ্ছেন, মামলা না চালাতে। কিন্তু মামলা তো এখন রাষ্ট্রের হাতে। অসহায়, নিরীহ লোকগুলোকে বাঁচাতে চাচ্ছেন তিনি। তবে নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।’

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দুপুর পৌনে ২টার দিকে বাড্ডার তিন রাস্তার মোড়ে ইউলুপে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেখানে গুলিবিদ্ধ হন রায়হান। খবর পেয়ে স্বজনসহ অন্যরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। বিকাল ৪টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় রায়হানের কৃষক বাবা কামাল হোসেন ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল শেখ হাসিনাসহ ২৩৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান হত্যাচেষ্টা মামলা 

চাকরির সন্ধানে এসে জুলাই আন্দোলনে আহত হন অটোরিকশা চালক মেহেদী হাসান। এ ঘটনায় করা তার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই সেলিম উদ্দীন গত ২০ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে ও আলমাছ নামে এক ব্যক্তিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন।

এসআই সেলিম উদ্দীন বলেন, ‘গত মাসে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। বাদী এজাহারে যাদের নাম দিয়েছে এবং তদন্ত করে যা পেয়েছি, সেই মোতাবেক আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছি।

শেখ হাসিনার সঙ্গে অভিযুক্ত অপর আসামিরা হলেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাদেক খান, আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজীব, রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়।

আলমাছ নামক এক ব্যক্তিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে রবিবার মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট বিকাল ৪টার দিকে মোহাম্মদপুর থানার ময়ূরভিলার সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। একটি গুলি মেহেদীর ডান হাতের বাহুর একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে চলে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে শিকদার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পথচারী ও আন্দোলনকারীরা। পরদিন পালিয়ে অন্যত্র গিয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে ৮ সেপ্টেম্বর মামলা করেন মেহেদী।