বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি: আখতারুজ্জামানের জামিন মেলেনি 

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।  

আসামি পক্ষের জামিন আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. সাদেকীন হাবীব বাপ্পী এই আদেশ দেন। 

জামিন শুনানিতে আখতারুজ্জামানের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির, আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন আইনজীবী জামিন চেয়ে প্রার্থনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এই জামিনের বিরোধিতা করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করেন।

জামিন আবেদনের শুনানিতে আসামি পক্ষে শিশির মনির বলেন, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মামলা সেখানে কোনও ক্রিমিনাল কেস নেই। শুধু কথা-কাটাকাটি ছিল। এর বাইরে আর কিছুই ঘটেনি। এর মধ্য দিয়ে তিনি এমন হেন কোনও অপরাধ করেনি। সুতরাং এই মামলার ধারা জামিনের যোগ্য ধারা। আমরা তার জামিন চাই। 

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কী হয়েছে না হয়েছে আমরা তা দেখেছি মিডিয়াতে। এটা প্রচুর প্রচারণা হয়েছে। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই। স্বাভাবিকভাবে কথা বলা এক রকম, আর ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে কথা বলা আরেক রকম। আপনি নিশ্চয়ই সেটা দেখেছেন যে, তার আচারণ কেমন ছিল। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার আইনে কী আছে সেটা জানেন। সেটা কী অন্যায় নয়?   

শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশের এয়ারপোর্টগুলোর অবস্থা সম্পর্কে আপনি জানেন মাননীয় আদালত। 

এ সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মেজর আখতারুজ্জামান সাহেব সেখানে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে। উনি একজন সাধারণ মানুষ। কোনও দলের নেতাও না। শুধু অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এতদিন কারাগারে রাখা হয়েছে।  

দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেন। 

গত ২ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ধামাল কোট এলাকার ১০ নম্বর রোডের ৩৫ নম্বর নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন গত ৩ অক্টোবর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার একদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। রিমান্ড শেষে গত ৪ অক্টোবর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, “গত ১ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে ঢাকায় আসেন। ফ্লাইটটি সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে এবং ৯টা ৮ মিনিটে পার্কিং করে। পরে যাত্রীরা বিমানবন্দরের ২১ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালে প্রবেশ করেন এবং ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে লাগেজ সংগ্রহের জন্য ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় যান।”

“ওই সময়ে বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয় এবং ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভঙ্গ করে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব হওয়া এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি উত্তেজিত ও অশোভন আচরণ করতে থাকেন।”

“এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান হঠাৎ তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত রূঢ়, অশালীন ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।”

“নির্বাহী পরিচালক অত্যন্ত শান্তভাবে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ এবং ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে প্রকাশ্যে তাকে বলেন, ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা, গেট আউট ফ্রম হিয়ার, ঘাড় ধরে বের করে দিবো, কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিংয়ে আসবেন, মাইর খাইতে চান?’ এ সময় আখতারুজ্জামানের আচরণ ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী।

“পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় মোহাম্মদ কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে আখতারুজ্জামান পুনরায় উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেন, আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।”

“এ ছাড়া তিনি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সম্পর্কে অত্যন্ত অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন। বলেন, ‘হি ইজ আ বাস্টার্ড, বিমানবন্দরের জন্য কিছুই করছে না।’”

“এ সময় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কতিপয় প্রটোকল সহকারী এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে থাকেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করার হুমকি দেন। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।”

“ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআই-ভুক্ত এলাকায় ভিডিও ধারণ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিষেধ করেন। এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আখতারুজ্জামান তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন। এ ছাড়া তিনি অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল/পাত্র ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ক্ষতি সাধন করেন।”