একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে, এটা হাস্যকর দাবি: তাহসিফের বাবা

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। দীপের দাবি, ঘটনার রাতে ঘটনাস্থলে পুলিশের মতো দেখতে দুজনকে দেখে তারা দৌড় দিয়েছিলেন। তবে এ বক্তব্যকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন তাহসিফের বাবা। তার প্রশ্ন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবেন, এটা কীভাবে সম্ভব?

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাহসিফের বাবা বলেন, ‘হাস্যকর বক্তব্য না? কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে—এটা হাস্যকর বক্তব্য না? এটা তো প্রশ্নই আসে না।’

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি জানিয়ে তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে তার মতে, এ ঘটনায় মামলা করার প্রয়োজন হবে না। সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি দেখবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনো ভাবি নাই। আমরা পারিবারিকভাবে এটা আলোচনা করব, পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? এটা সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই তো আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি... কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়ে গেছে; সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং অত্যন্ত অ্যাক্টিভভাবে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে।’

তাহসিফের সঙ্গে দীপের পরিচয়ের বিষয়ে তার বাবা বলেন, তাহসিফ অন্য চাকরি করায় তার ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘দ্বীপ’ পড়াশোনার পাশাপাশি দেখাশোনা করতেন দীপ। বিভিন্ন কোম্পানিতে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজ করত প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে দীপের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল। মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় যাতায়াত ছিল তার। এমনকি দীপের বাবা-মা ও ছোট ভাইও একবার তাদের বাসায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া করেছেন।

ছেলের নিখোঁজ হওয়ার রাতের বর্ণনা দিয়ে তাহসিফের বাবা বলেন, রাতে সর্বশেষ মাকে মেসেজ দিয়ে তাহসিফ জানিয়েছিলেন, তিনি রওনা হয়েছেন এবং এখনই বাসায় ফিরছেন। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনে আর যোগাযোগ করা যায়নি। ছেলের ফেরার অপেক্ষায় সারারাত বসে ছিলেন তার মা। কিছুক্ষণ পরপর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাননি।

তিনি বলেন, ‘আমি তো ঘুমিয়েছিলাম। সকালে উঠে যখন দেখি ছেলে আসে নাই, তখন আমিও চেষ্টা করেছি। বন্ধ পেয়েছি। তারপরে দুপুরে আমি তুরাগ থানায় গিয়েছি খবর নিতে।’

এরপর উত্তরখান থানা থেকে সন্ধ্যার কিছু আগে তাকে ফোন করে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানানো হয়। কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, ‘আমার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে, আমার ছেলের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে আমাকে জানাল যে, তার ডেডবডি পাওয়া গেছে রাজাবাড়ী ঘাটে।’

তাহসিফ ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন না তার বাবা। তিনি বলেন, ছেলে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। তাই অন্য কোনও ধারণার প্রশ্ন আসে না। সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় যেতেন বলে তিনি জানেন।

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ঘটনার তথ্য উদ্‌ঘাটনের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই যে একজন সুনাগরিক হিসেবে সে দেশের জন্য একটা অ্যাসেট, অ্যাজ বিকজ হি ইজ এ পাইলট... তো সরকার নিশ্চয়ই অত্যন্ত আন্তরিক হবে, অত্যন্ত দায়িত্ববান হবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে, তথ্য উদ্‌ঘাটন করতে এবং এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে—এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই আমাদের সরকার অত্যন্ত আন্তরিক পদক্ষেপ নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছেন তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তার দাবি, ঘটনার রাতে ঘটনাস্থলে পুলিশের মতো দেখতে দুজনকে দেখে তারা দৌড় দেন। তবে ওই দুজন প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তা যাচাই করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শুক্রবার পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, তাহসিফ যেদিন রাতে নিখোঁজ হন, সেদিন তার সঙ্গে বন্ধু দীপ ছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। দীপের দেওয়া সব তথ্য সরাসরি বিশ্বাস না করে প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

দীপের বক্তব্যের বরাত দিয়ে এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘তিনি (দীপ) বলেছেন, সেখানে দুজন পুলিশ ছিল। তাদের দেখে তারা দৌড় দিয়েছেন। এখন তারা কারা, তা আমরা যাচাই করে দেখবো। আদৌ কোনও পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, ইউনিফর্ম পরা পুলিশ ছিলেন কি না কিংবা কারও দায়িত্ব ছিল কি না, এসব বিষয় যাচাই করা হবে।’

পিবিআই কর্মকর্তা আরও বলেন, দীপ আগের দিন তাদের জানিয়েছিলেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের সঙ্গে আলাদা হয়ে তারা দুজন দুই দিকে চলে যান। তাহলে রাত ২টার দিকে তারা কেন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে যাওয়ার কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

পিবিআই কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ছায়া তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই না করে কোনও তথ্য প্রকাশ করলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তাই প্রতিটি তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই তা জানানো হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় ‘দীপ আসছে, ওর সঙ্গে কথা বলে আসি’—মাকে এ কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।