বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে এবার তদন্তকারীদের নজর— সেই রাতের বিশেষ কয়েক মিনিটের দিকে। মৃত্যুর আগে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাহসিফের সঙ্গে অবস্থানকালে তার বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ১৫ থেকে ২০ মিনিট কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তার।
এমনকি তাহসিফকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে, হত্যার উদ্দেশ্য কী এবং আরও কে কে জড়িত ছিলেন কি না, সেসব বিষয়ও এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। ফলে সাত দিনের ব্যবধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও তথ্য সামনে আসলেও তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি। নতুন করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দীপকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাতের আদালত দীপের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আটটি কারণ উল্লেখ করে তাকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নৌপুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘তদন্ত চলছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আরও জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এজন্য দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে দীপকে।’’
২০ মিনিটের গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন
তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফের মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে দীপ ও তাহসিফের ঘনিষ্ঠ এক তরুণীর চলাফেরার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালে দীপ কিছু সময়ের জন্য অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেছে পুলিশ। ওই ১৫ থেকে ২০ মিনিট তিনি কোথায় ছিলেন এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা যাচাই করতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের আবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীর সঙ্গে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালে দীপ কিছু সময়ের জন্য অন্যত্র সরে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট কোথায় যোগাযোগ করেছেন, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তদন্তকারীদের কাছে এই সময়ের গতিবিধি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও ওই সময়ে দীপ কোথায় ছিলেন কিংবা কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে গভীর রাতের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ওই সময়ের কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েও প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ
প্রথম দফার রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে সেসব তথ্য এখনও যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, দীপ ‘অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির’। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং কোনও কোনও প্রশ্নে নীরব থেকেছেন। এ কারণে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে দীপ ঠিক কী তথ্য দিয়েছেন? সেসব তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য সাক্ষ্যের কতটা মিল পাওয়া গেছে? কোন বিষয়গুলোতে এখনও অসংগতি রয়ে গেছে? তবে ‘তদন্তের স্বার্থে’ প্রথম দফায় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ।
হত্যার স্থান ও উদ্দেশ্য এখনও তদন্তকারীদের অনুসন্ধানে
তাহসিফের লাশ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হলেও তাকে কোথায় হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, সে বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। আদালতে জমা দেওয়া দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনে হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণ এবং হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে পুলিশ।
গত ২৮ অক্টোবর বিকালে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এর আগের দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে উত্তরার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই তার মৃত্যুর কারণ ও শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন তাহসিফ, শেষবার কার সঙ্গে ছিলেন এবং কীভাবে তিনি তুরাগ নদে পৌঁছালেন, এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা এখন সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
দীপের বক্তব্য ও মোটরসাইকেল উদ্ধারেও নতুন প্রশ্ন
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছেন তার জুনিয়র বন্ধু দীপ। গত ২৯ অক্টোবর তিনি জানিয়েছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গভীর রাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা দীপ স্বীকার করেছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যে উঠে এসেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গত ৩০ অক্টোবর সকালে ওই এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
ফলে দীপের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্যের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গভীর রাতে তারা কেন ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে কী ঘটেছিল, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা। তদন্ত কর্মকর্তার দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনেও বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ দীপের উপস্থিতিতে যাচাই বাছাই এবং বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আট কারণে ফের রিমান্ড
আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে দীপকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার আটটি কারণ তুলে ধরেছে নৌপুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজ দীপের উপস্থিতিতে যাচাই বাছাই, নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালে তার ১৫ থেকে ২০ মিনিটের গতিবিধি ও যোগাযোগের তথ্য পর্যালোচনা এবং তাহসিফ, দীপসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের সিডিআর সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ। এ ছাড়া হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, অজ্ঞাতপরিচয় অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধার, হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং হত্যাকাণ্ডের স্থান নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মৃত্যুর আগে তাহসিফকে দীপ ও সেই তরুণীর সঙ্গে ঘোরাফেরা এবং বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে দেখা গেছে। শেষবার তাদের সঙ্গেই তাহসিফকে দেখা যাওয়ায় মামলার ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনও না কোনওভাবে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা।
সেই তরুণীও রিমান্ডে, তদন্তের কেন্দ্রে শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তার ‘বান্ধবীকেও’ গ্রেফতার করা হয়েছে। গত রবিবার (১ নভেম্বর) তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন আদালত। ঘটনার রাতে উত্তরার একটি বারে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা গিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে মৃত্যুর আগে তাহসিফের সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তির বক্তব্য এবং তাদের চলাফেরার ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম গত ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন আদালত তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠান।