হঠাৎ যত্রতত্র ককটেল, পুলিশ ধরছে নিক্ষেপকারীদের নাকি সন্দেহভাজনদের?

সন্ধ্যার ব্যস্ততা তখনও কমেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। হঠাৎ টিএসসি এলাকায় পরপর দুটি বিকট শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কিছুক্ষণ পর একই শব্দ শোনা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশে, ভিসি চত্বর ও মুক্তি-গণতন্ত্র তোরণের সামনে। দৌড়ে পালানোর সময় কয়েকজনকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। রবিবার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর আরও কয়েকটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কার্যালয়ের সামনেও বিস্ফোরিত হয় ককটেল।

এর আগের রাতেও একই চিত্র দেখা গেছে যাত্রাবাড়ীতে। রাত ১টার পর চৌরাস্তা মোড়ে পরপর তিন থেকে চারটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় দুই ব্যক্তি। তার কয়েক ঘণ্টা আগে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গেন্ডা বাসস্ট্যান্ডে উপজেলা পরিষদের ফটকের সামনে বিস্ফোরিত হয় আরেকটি ককটেল। সেখানে কে বা কারা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তা জানাতে পারেননি প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এভাবে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটছে। কখনও থানার সামনে, কখনও পুলিশ স্থাপনা, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কোথাও হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, কোথাও সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ছে তাদের চলাচল। প্রতিটি ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত, অভিযান ও শনাক্তের চেষ্টা চালানোর কথা জানাচ্ছে। কিন্তু এসব বিস্ফোরণের নেপথ্যে কারা, আর আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে হামলার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা কতটুকু; তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পুলিশ কি ককটেল নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পারছে, নাকি সন্দেহভাজন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের দিয়েই পূরণ হচ্ছে গ্রেফতারের হিসাব? ককটেল তৈরি, সরবরাহ এবং বিস্ফোরণের নির্দেশদাতারাই-বা কারা?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েকটি ঘটনায় বিস্ফোরণের সময় কিংবা পালানোর পথে সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ আলোচিত ঘটনার পর পুলিশের তাৎক্ষণিক বক্তব্যে উঠে এসেছে হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়া, পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা এবং তদন্তের কথা। পুলিশের দাবি, পরিকল্পিতভাবে জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে একটি গোষ্ঠী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।

রাজধানীতে অর্ধশতাধিক বিস্ফোরণ, আট বাসে আগুন

গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত আটটি বাসে আগুন এবং অর্ধশতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অন্তত আটটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। আদাবর, শাহবাগ, খিলগাঁও, বিমানবন্দর ও মিরপুরের কালশী এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দফতরের ভেতরে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আশপাশের কোনও ভবনের ছাদ কিংবা নিচের স্থান থেকে ককটেলটি নিক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে।

রাত সোয়া ৯টার দিকে আদাবর থানার সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জানান, মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন ব্যক্তি থানার বিপরীত পাশ থেকে ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। কারা এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

একই রাতে শাহবাগে পুলিশের ডিউটি গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে জুলাই চত্বরের পাশেও বিস্ফোরণ ঘটে। বিমানবন্দর গোলচত্বরের উড়ালসড়ক থেকে দুটি ককটেল ছোড়া হয়। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার জানান, নিক্ষেপকারীরা পালিয়ে যায়।

কালশী মোড়েও নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলে এসে বিস্ফোরণ ঘটানোর দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের সামনে এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ৩ নম্বর গেটের সামনে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। ওই রাতের ঘটনায় কাউকে আটকের তথ্য পাওয়া যায়নি। ২ নভেম্বর সোবহানবাগে ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলের কাছেও ককটেল বিস্ফোরিত হয়।

শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে বনানীর সেতু ভবন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হলে গার্ড রুমের কাচ ভেঙে যায়। ঘটনাস্থল থেকে আরেকটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। বনানী থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন জানান, হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। একই রাতের দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

কয়েকটি ঘটনায় গ্রেফতার, মিলেছে বিস্ফোরক

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩০ অক্টোবর কলাবাগানের ঘটনা কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের সময় এবং পালানোর পথে চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযানে প্রথমে তিনটি এবং পরে গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ১০টি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে যাওয়া ধানমন্ডি থানার ওসিকেও লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। তিনি দুজনকে আটক করেন। অন্য দুজনকে কলাবাগান থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। ফলে এ ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘটনাস্থলের যোগসূত্র এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের তথ্য রয়েছে।

অন্যদিকে, ২৩ অক্টোবর পুরোনো রমনা থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ৩০ অক্টোবর দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চারটি ককটেল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের অতীত তদন্তে ভাড়ায় ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগও উঠে এসেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনায় রেজাউল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। ধানমন্ডি থানার তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলামের দাবি ছিল, কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাকে ককটেল নিক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ এ তথ্য জানায়।

এতে দেখা যায়, ককটেল নিক্ষেপকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতা একই ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে আগের ওই ঘটনার সঙ্গে নভেম্বরের বিস্ফোরণগুলোর কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নাশকতার উদ্দেশ্য দেখছে ডিএমপি

রবিবার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মো. আকতার হোসেন বলেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুনের প্রতিটি ঘটনা পুলিশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন সংগঠন ও অঙ্গসংগঠনের সদস্য রয়েছেন।

তিনি জানান, সার্বিক ঘটনা পর্যালোচনায় পুলিশের ধারণা, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নাশকতা ও জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান ও পুলিশ মোতায়েন জোরদার করা হয়েছে। মোবাইল পার্টি, পিকেট ডিউটি এবং নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।

ককটেল তৈরির উপাদানের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে আকতার হোসেন বলেন, এর আগেও গোয়েন্দা পুলিশ বিস্ফোরকদ্রব্য ও ককটেল তৈরির উপাদানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। কোথাও নাশকতার উদ্দেশ্যে দাহ্য পদার্থ কেনাবেচা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেও সংশ্লিষ্টদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

নিক্ষেপকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতা কারা?

আদাবর, শাহবাগ, বিমানবন্দর, কালশী ও যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় মোটরসাইকেলে এসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও ভিডিও ফুটেজও রয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্যে সব ঘটনায় নিক্ষেপকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের বিষয়ে নিশ্চিত অগ্রগতি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একাধিক এলাকায় একই ধরনের হামলার পেছনে অভিন্ন কোনও দুর্বৃত্তচক্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ককটেলগুলো কোথায় তৈরি হচ্ছে, কারা বহন করছে, নির্দেশ আসছে কোথা থেকে এবং বিস্ফোরণের পর পালানোর ব্যবস্থা কারা করছে, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গ্রেফতার যেমন জরুরি, তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে সন্দেহের ভিত্তিতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্তে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনও গ্রেফতার ব্যক্তিকে সরাসরি নিক্ষেপকারী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।