দ্য ব্রুনাই টাইমস

ইউরোপে শরণার্থীদের আটকের সমালোচনায় জাতিসংঘ

ইউরোপে ক্রমবর্ধমান হারে শরণার্থীদের আটকের সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ। পুরো পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ হাই কমিশনার জাইদ রাদ আল হোসেইন। এ বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার শিরোনাম করেছে ব্রুনাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ব্রুনাই টাইমস।

সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের দ্বিতীয় বার্ষিক সভায় দেওয়া বক্তব্যে ইউরোপে শরণার্থীদের সঙ্গে করা আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন জাইদ রাদ আল হোসেইন।

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি ইউরোপে শরণার্থীদের আটকের বিষয়টি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এমনকি আটককৃতদের মধ্যে নিঃসঙ্গ শিশুরাও রয়েছে।

এদিকে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশী শিশুদের মধ্যে একটি বড় অংশই শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও বাধ্যতামূলক শ্রমশোষণের শিকার হচ্ছে। ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বহু অভিবাসনপ্রত্যাশী শিশু-কিশোরের। ১৪ জুন ২০১৬ মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এ তথ্য জানিয়েছে।

TBT

অভিবাসনপ্রত্যাশী ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বাড়ছে বলেও জানায় ইউনিসেফ। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রতি পদে বিপদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে’ ওই শিশুরা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছেছেন অন্তত ২ লাখ ৬ হাজার ২০০ অভিবাসন প্রত্যাশী। এদের মধ্যে প্রতি তিনজনে একজন শিশু।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই যাত্রার প্রতি পদে বিপদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে এই শিশুদের, এদের মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনে একজন শিশু মা-বাবা অথবা কোনও অভিভাবক ছাড়াই ভ্রমণ করছে বিপদসঙ্কুল এই পথ। নারী ও শিশুরা মানব পাচারকারী চক্রের হাতে পড়ছে, এমন প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া ইউরোপে পাড়ি দেওয়া শরণার্থী শিশুদের শিশু রক্ষা কেন্দ্র বা অন্য কোন বিকল্পের অভাবের ফলে প্রায়ই কারাগারে বা পুলিশ হেফাজতে রাখা হচ্ছে।’

জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত স্বপ্নভূমির উদ্দেশে দেশ ছাড়ছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাহাজ বা নৌকায় চড়ে বসছেন অসংখ্য শরণার্থী। আর উত্তাল সাগরের বুকে একের পর নৌকাডুবিতে প্রাণ যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০১৫ সালে অধিকতর ভালো জীবনের সন্ধানে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। মানব পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হয়েছেন ১০ সহস্রাধিক মানুষ। আর বিদেশি বিদ্বেষী নীতি এবং বিদ্যমান ভয়-আতঙ্কে বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়াজুড়ে জীবন বাঁচাতে আর মাথা গোঁজার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর নানা দিকে ছোটাছুটির ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। ২০১৪ সালে যুদ্ধ-দাঙ্গাপীড়িত বা অভাবের তাড়নায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ নিজের জন্মভূমি আর ঘরবসত ছেড়ে নানা দেশে পাড়ি দিয়েছিল। সেই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের একটা বড় অংশই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিক। যুদ্ধাবস্থা থেকে বাঁচতে দলে দলে ভিনদেশের পথে ছুটছেন দেশটির বাসিন্দারা।

২০১৫ সালে ইউরোপের অভিবাসী এবং শরণার্থী–বিষয়ক সংগঠনগুলো মূল সমস্যার পাঁচটি উপাদান চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে—১. সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধের তীব্রতা আরও বেড়ে যাওয়া, ২. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে শিগগিরই সমস্যা সমাধানের আশা না থাকা, ৩. প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থীদের সমস্যা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে অনীহা, ৪. তুরস্কে বসবাসরত সিরিয়ার শরণার্থীদের যেকোনো সময় ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা, ৫. সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভক্ত বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়া, কসোভো মন্টেনেগ্রো ও মেসিডোনিয়ার মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

২০১৫ সালে সমুদ্রে তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝামাঝি এলাকায় নিহত হয়েছেন ৭০০-এর বেশি শরণার্থী। এদের মধ্যে অন্তত ১৮৫ জন শিশু। এই শিশুদের অন্তত পাঁচ শতাংশের বয়স দুই বছরের কম। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব শিশুদের অধিকাংশই সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে পরিবারের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। এদের অধিকাংশের বয়স ১২ বছরের নিচে।

২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে তুরস্কের উপকূলে সন্ধান মেলে আয়লান নামের এক সিরীয় শিশুর মৃতদেহ। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে নিথর পড়ে থাকা শিশু আয়লান কুর্দির নাম শুনলে এখনও স্তব্ধ হয়ে যান অনেকে। ছোট নৌকায় থাকা আয়লান ও তার ভাই ভেসে যায় তুরস্কের সৈকতে। তাদের মা ভেসে যান দূরের অন্য এক সৈকতে। এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে সাগরে ভাসছেন হাজার হাজার আয়লান কুর্দি। এই শরণার্থীদের সলিল সমাধি যেন থামছেই না।

/এমপি/এএ/