দ্য ব্রুনাই টাইমস

বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা সাড়ে ৬ কোটি

বিশ্বে যুদ্ধ বা সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হওয়া মানুষের সংখ্যা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৫৩ লাখ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার মতে, এ সংখ্যা আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি। এই ৬ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে শরণার্থী ছাড়াও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও অভিবাসনপ্রত্যাশীও আছে। এ বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার শিরোনাম করেছে ব্রুনাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ব্রুনাই টাইমস।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এখন বিশ্বের ১১৩ জন মানুষের মধ্যে ১ জন শরণার্থী। গত বছরের শেষ নাগাদ এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০ জুন ২০১৬ সোমবার বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘ বলেছে, বিশ্বে এই প্রথম শরণার্থীর সংখ্যা ৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এসব শরণার্থীর মধ্যে অর্ধেকই এসেছে মাত্র তিনটি দেশ থেকে। দেশগুলো হলো সিরিয়া, আফগানিস্তান ও সোমালিয়া।

গত বছর ইউরোপে শরণার্থীর ঢল নামে। তবে জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের মোট শরণার্থীর ৮৬ শতাংশ আশ্রয় নিয়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আছে তুরস্কে। এর সংখ্যা ২৫ লাখ। এরপরই রয়েছে পাকিস্তান ও লেবানন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দুর্গম সাগর পাড়ি দিয়ে ১০ লাখের বেশি শরণার্থী ইউরোপে ঢুকে পড়ে। তবে অন্য সংস্থাগুলো বলছে, এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। আইওএম বলেছে, শরণার্থীদের মধ্যে ৩৫ হাজার এসেছে স্থলসীমান্ত দিয়ে। ইউরোপে আসা শরণার্থীদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য ছিল জার্মানি ও সুইডেন।

শরণার্থীদের যে সংখ্যা জাতিসংঘ দিয়েছে, এর মধ্যে গত বছর নতুন অভিবাসন নীতিমালার আলোকে আশ্রয় পাওয়া মানুষের সংখ্যা গণনা করা হয়েছে। তবে তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া অস্থায়ী সুরক্ষা প্রকল্পের অধীন শরণার্থীদের এর মধ্যে গণনা করা হয়নি।

TBT

বিশ্বজুড়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইউরোপে বেড়ে যাচ্ছে ‘বিদেশি বিদ্বেষ’। এ কথা বলেছেন খোদ জাতিসংঘের শরণার্থীপ্রধান ফিলিপ্পো গ্রাঁদি। তিনি বলেছেন, শরণার্থী বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নে ইউরোপীয় নেতাদের আরও কাজ করতে হবে। শরণার্থীদের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পাল্টাতেও তাঁদের অনেক কিছু করার আছে। তিনি বলেছেন, ইউরোপজুড়ে থাকা ‘বিদেশি বিদ্বেষী’ হাওয়া সত্যিই ভীতিকর।

জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৫ সালে অধিকতর ভালো জীবনের সন্ধানে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু। মানবপাচারকারীদের শিকারে পরিণত হয়েছেন ১০ সহস্রাধিক মানুষ। আর বিদেশি বিদ্বেষী নীতি এবং বিদ্যমান ভয়-আতঙ্কে বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুনিয়াজুড়ে জীবন বাঁচাতে আর মাথা গোঁজার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর নানা দিকে ছোটাছুটির ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। ২০১৪ সালে যুদ্ধ-দাঙ্গাপীড়িত বা অভাবের তাড়নায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ নিজের জন্মভূমি আর ঘরবসত ছেড়ে নানা দেশে পাড়ি দিয়েছিল। সেই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের একটা বড় অংশই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিক। যুদ্ধাবস্থা থেকে বাঁচতে দলে দলে ভিনদেশের পথে ছুটছেন দেশটির বাসিন্দারা।

গতবছর ইউরোপের অভিবাসী এবং শরণার্থী–বিষয়ক সংগঠনগুলো মূল সমস্যার পাঁচটি উপাদান চিহ্নিত করেছে। এগুলো হচ্ছে—১. সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধের তীব্রতা আরও বেড়ে যাওয়া, ২. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে শিগগিরই সমস্যা সমাধানের আশা না থাকা, ৩. প্রতিবেশী দেশগুলোর শরণার্থীদের সমস্যা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে অনীহা, ৪. তুরস্কে বসবাসরত সিরিয়ার শরণার্থীদের যেকোনো সময় ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা, ৫. সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভক্ত বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়া, কসোভো মন্টেনেগ্রো ও মেসিডোনিয়ার মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

২০১৫ সালে সমুদ্রে তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝামাঝি এলাকায় নিহত হয়েছেন ৭০০-এর বেশি শরণার্থী। এদের মধ্যে অন্তত ১৮৫ জন শিশু। এই শিশুদের অন্তত পাঁচ শতাংশের বয়স দুই বছরের কম। ভাগ্যবিড়ম্বিত এসব শিশুদের অধিকাংশই সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে পরিবারের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। এদের অধিকাংশের বয়স ১২ বছরের নিচে।

২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে তুরস্কের উপকূলে সন্ধান মেলে আয়লান নামের এক সিরীয় শিশুর মৃতদেহ। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে নিথর পড়ে থাকা শিশু আয়লান কুর্দির নাম শুনলে এখনও স্তব্ধ হয়ে যান অনেকে। ছোট নৌকায় থাকা আয়লান ও তার ভাই ভেসে যায় তুরস্কের সৈকতে। তাদের মা ভেসে যান দূরের অন্য এক সৈকতে। এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে সাগরে ভাসছেন হাজার হাজার আয়লান কুর্দি। এই শরণার্থীদের সলিল সমাধি যেন থামছেই না।

/এমপি/