বিরোধীদের সমালোচনা উপেক্ষা করেই ভারতের লোকসভায় পাস হলো আধার বিল। বুধবার রাজ্যসভায় বিলের পক্ষে সংশোধনী প্রস্তাব আনেন কংগ্রেসের এমপি জয়রাম রমেশ। রাজ্যসভায় মোদি শিবিরের তেমন বিরোধীতা না থাকায়, কণ্ঠভোটেই পাস হয় এই সংশোধনী প্রস্তাব। রাজ্যসভা থেকে ওয়াক আউট করে আধার বিলে একাধিক আপত্তি আনেন বিসএসপি, তৃণমূল, এবং বিজেডি’র এমপিরা। তবে বিরোধীদের তুমুল সমালোচনা সত্ত্বেও লোকসভায় এদিন পাশ হয় আধার বিল। এ বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবারের প্রধান শিরোনাম করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বিরোধীরা প্রশ্ন তোলেন, কেন এই বিলকে অর্থবিলের তকমা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, নজরদারি রোখার দিকটি তেমন নেই বলেও অভিযোগ ওঠে।
নাগরিকদের 'গোপনীয়তা রক্ষা'র কথা বলেছিল বিরোধীরা। কেন 'অর্থ বিল'এই প্রশ্ন তুলে চারটি সংশোধনীজুড়ে লোকসভায় বিলটি ফেরতও পাঠানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত 'অর্থ বিলের' যুক্তি দেখিয়েই বুধবার লোকসভায় সংখ্যাধিক্যের জোরে আধার বিল পাস করাতে সক্ষম হয় বিজেপি সরকার। এর ফলে বিভিন্ন ভর্তুকি ও পরিষেবা ঠিক লোককে পাঠানোর সুবিধার পাশাপাশি দেশের কোটি কোটি মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্যও চলে আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের মুঠোয়। 'জাতীয় সুরক্ষা'র স্বার্থে তা সুবিধামতো প্রকাশ করার অধিকারও পাবে সরকার।
'আধার’ (টার্গেটেড ডেলিভারি অফ ফিনান্সিয়াল অ্যান্ড আদার সাবসিডিস, বেনেফিট্স অ্যান্ড সার্ভিসেস) নামের বিলটি নিয়ে এদিন রাজ্যসভায় সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে তীব্র বিতণ্ডা চলে। তর্কে জড়িয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও সিপিএম-দলীয় এমপি সীতারাম ইয়েচুরি।
চারটি বিষয়ে আপত্তি তুলে কংগ্রেসদলীয় এমপি জয়রাম রমেশ সংশোধনী পেশ করেন। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে বিরোধীদের দাবি ছিল, আধারকে 'বাধ্যতামূলক' না করা; 'জাতীয় সুরক্ষা' নয়, বরং গণসুরক্ষা বা সেই সংক্রান্ত আপদলীন পরিস্থিতিতে আধারের তথ্য প্রকাশের নিয়ম থাকা এবং বেসরকারি ব্যক্তি বা সংস্থা যেন আধার বাধ্যতামূলক করার অধিকার না পায়।
রমেশ বলেন, 'কাল যদি মোবাইল সংযোগ নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আমার আধার নম্বর চায়, তখন কী হবে!'
প্রসঙ্গত ভারতের সমাজকর্মীদের একাংশ গত কয়েক মাসে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আধার কার্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি দেশবাসীর বিভিন্ন তথ্য অসাধু উদ্দেশ্য ব্যবহার করা হতে পারে। এমনকি 'অপছন্দের' ব্যক্তিদের নিশানা করতেও তা কাজে লাগাতে পারে বিভিন্ন ক্ষমতাশালী মহল।
অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, 'আধার বাধ্যতামূলক হবে না। তবে এই কার্ড না থাকলে, অন্যান্য পরিচয়মূলক নথিপত্র দিতে হবে। আর আধার ব্যবহারকারীরা রাজ্য সরকারের মাধ্যমেই যাবতীয় সুবিধা পাবেন। কাল যদি তামিলনাড়ু সরকার ঠিক করে, বিশেষ একটি আয়সীমার নিচে থাকা ব্যক্তিদের কিছু সুবিধা দেওয়া হবে, তখন তা পেতে গেলে (আধার) বাধ্যতামূলক হবে।'
বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এক্ষেত্রে রাজ্যসভার মতামতকে অগ্রাহ্য করতেই বিলটিকে 'অর্থবিল' হিসেবে লোকসভায় পেশ করেছিল সরকার। তাও পার্লামেন্ট অধিবেশন শেষ হওয়ার দু'দিন আগে। কারণ, অর্থবিলের ক্ষেত্রে রাজ্যসভার সংশোধনী লোকসভা না-ও মানতে পারে। আর, এক্ষেত্রে রাজ্যসভায় আলোচনা ১৪ দিনের মধ্যেই সেরে ফেলতে হয়। তা না হলে বিলটি আপনাআপনিই পাস হয়ে যায়। এবার বিরোধীদের রাজ্যসভা আরও দু'দিন চালানোর আর্জিও খারিজ করেছে সরকার।
কিন্তু জেটলির পাল্টা যুক্তি, এই বিলের মূল উদ্দেশ্য, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের অর্থ যাতে ঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা। তাই সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটা অর্থবিল। আর, এ ব্যাপারে লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তকে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।
সিপিএম-এর এমপি সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্য ছিল, আধারের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির একটি বেঞ্চের বিচারাধীন রয়েছে। আদালত মতামত দেওয়ার আগেই সরকার এ নিয়ে কারও কথা না-শুনে 'ঔদ্ধত্য ও তাড়াহুড়োর' সঙ্গে এগোতে চাইছে। জেটলির জবাব, 'গোপনীয়তা কোনও চরম অধিকার নয়। তাছাড়া সরকারের প্রশাসনিক একটি সিদ্ধান্ত বিচারাধীন রয়েছে। তাতে আইনসভায় বিল পাস আটকায় না। তাছাড়া সরকার অপেক্ষা করে বসে থাকলে তো আইনসভার অন্যান্য বিল নিয়েও মামলা হতে থাকবে।'
এরপর বুধবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ রাজ্যসভার দেওয়া চারটি সংশোধনীসহ বিলটি লোকসভায় ফেরত পাঠানো হয়। লোকসভায় সংখ্যাধিক্যের জোরে ওই সংশোধনীগুলি খারিজ করে দিয়ে তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটের মাধ্যমে বিলটিকে অপরিবর্তিত অবস্থাতেই পাস করতে সক্ষম হয় সরকার সমর্থকরা। এর আগে জেটলি দাবি করেন, 'গণসুরক্ষা' বা 'গণআপদকালীন অবস্থা' শব্দগুলোর কোনও সংজ্ঞা সংবিধানে নেই।
আধার সংখ্যার জন্য নেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য গোপন থাকবে কি না, এক দিকে তা নিয়ে প্রশ্ন। অন্যদিকে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নিরাপত্তার নামে সরকার দেশের মানুষের উপরে নজরদারি চালাতে পারে, সেই সংশয়। মূলত এই দুই যুক্তিতে প্রবল রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ে মোদি সরকার।
আধার বিলে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আধারের জন্য দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি অভিযোগ তোলেন, জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার জেএনইউ ও হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের উপর কী ধরনের দমননীতি নিয়েছে, তা সকলে জানে। আধারের জন্য দেওয়া তথ্য বেসরকারি সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে লাগাতে পারে বলেও সংশয় রয়েছে। জেটলি বোঝানোর চেষ্টা করেন, কারও অনুমতির ভিত্তিতেই আধারের তথ্য অন্য কাউকে দেওয়া হবে।
গত ১১ মার্চ নিম্নকক্ষে সামান্য আলোচনার পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস করিয়ে রাজ্যসভায় পাঠানো হয়েছিল।
/এমপি/