শিশুর শরীর হঠাৎ গরম হয়ে উঠলো। চোখে পানি, নাক দিয়ে সর্দি, একটু পরেই শরীরে দেখা দিল লালচে দানা। বাবা-মা প্রথমে ভাবলেন—সাধারণ ভাইরাল জ্বর। প্যারাসিটামল খাইয়ে ঘরেই রাখা হলো শিশুকে। কিন্তু দু–তিন দিনের মাথায় পরিস্থিতি বদলে যায়—শরীর আরও দুর্বল, র্যাশ ছড়িয়ে পড়ছে, শিশুটি খেতে চাইছে না।
এই “সাধারণ জ্বর” ভেবে অবহেলা করা অনেক সময়ই হতে পারে হামের শুরু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এমন একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা শুরুতে সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো মনে হলেও দ্রুত জটিল রূপ নিতে পারে—বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। আর বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতি এই ঝুঁকিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার বার্তা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ছয়’শ ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি, কিছু এলাকায় টিকা মিস হওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এই সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
হাম কী এবং কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস সহজেই অন্য শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম এমন রোগ যা একবার ছড়ালে খুব দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদান কম।
শিশুদের ক্ষেত্রে হাম শুধু জ্বর বা র্যাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
সাধারণ জ্বর নাকি হাম—শুরুতে কীভাবে বুঝবেন?
হামের শুরুটা প্রায়ই বিভ্রান্তিকর হয়। প্রথম ৩–৫ দিন অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই লাগে।
তবে কিছু লক্ষণ বিশেষভাবে সতর্ক করে—জ্বরের সঙ্গে সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়া; চোখে আলো সহ্য করতে না পারা; মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পট); জ্বরের কয়েকদিন পর শরীরে লালচে র্যাশ ছড়িয়ে পড়া; শিশুর অতিরিক্ত দুর্বলতা ও খেতে অনীহা।
এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ জ্বর ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কেন শিশুদের ঝুঁকি বেশি?
এক বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের পূর্ণ টিকা নেওয়া হয়নি—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই ছোট শিশু, যাদের ইমিউন সিস্টেম এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি।
কখন হাসপাতালে নেওয়া জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের পরিস্থিতিতে দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়া জরুরি—জ্বর ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে; শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া শুরু হলে; শিশুর অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা অচেতনভাব; খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে; শরীরে র্যাশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকা। নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা নেওয়া হলে রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জনসংখ্যার বড় অংশ টিকাদানের আওতায় থাকলে হামের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদানে ঘাটতি ও কিছু এলাকায় মিসড ডোজের কারণে ঝুঁকি আবারও বেড়েছে—এটাই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
সর্বোপরি, হাম এমন একটি রোগ, যা শুরুতে সাধারণ জ্বরের মতো মনে হলেও সময়মতো শনাক্ত না হলে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অবহেলা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তাই জ্বরকে শুধু জ্বর হিসেবে না দেখে, তার পেছনের লক্ষণগুলো বোঝা এখন আরও জরুরি। কারণ কখনও কখনও “সাধারণ জ্বর” আসলে এক নীরব সতর্ক সংকেত—যার নাম হাম।