ভালোবাসারও গণিত আছে? ডেটিংয়ের ‘থার্টি সেভেন পার্সেন্ট’ তত্ত্ব কী বলছে

ধরুন, আপনি এমন একজন মানুষের খোঁজে আছেন, যার সঙ্গে জীবনের অনেকটা পথ একসঙ্গে হাঁটা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কখন বুঝবেন, আর খোঁজার দরকার নেই? কখন বলবেন, ‘হ্যাঁ, এই মানুষটিই আমার জন্য যথেষ্ট ভালো’?

ভালোবাসা, সম্পর্ক আর জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো সাধারণত হৃদয়ের ব্যাপার বলেই মনে করা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, গণিতবিদরাও এই প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন। শুধু ভেবেছেনই নয়, একটি তত্ত্বও দিয়েছেন—যার নাম ‘৩৭ শতাংশ রুল’।

শুনতে অবাক লাগলেও, এই তত্ত্বের দাবি হলো—জীবনের সব বিকল্প দেখার প্রয়োজন নেই। বরং একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করলেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

তবে এর মানে এই নয় যে ভালোবাসাকে ক্যালকুলেটরে বসিয়ে হিসাব করা যায়। বরং এই তত্ত্ব মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে শেখায়—আপনি কি খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি এত বেশি খুঁজছেন যে ভালো সুযোগও হাতছাড়া করছেন?

কোথা থেকে এলো ৩৭ শতাংশ রুল?

এই ধারণার উৎস ‘অপটিমাল স্টপিং থিওরি’—পরিসংখ্যান ও সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানের একটি পরিচিত তত্ত্ব।

ধরা যাক, আপনার সামনে ১০০টি সম্ভাব্য বিকল্প আছে। কিন্তু আপনি জানেন না, কোনটি সবচেয়ে ভালো। আবার সবগুলো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও নেই।

এই পরিস্থিতিতে তত্ত্বটি বলছে, প্রথম ৩৭ শতাংশ বিকল্পকে শুধু পর্যবেক্ষণ করুন। তাদের কাউকেই চূড়ান্তভাবে বেছে নেবেন না। এই অংশটি হবে শেখার সময়, অভিজ্ঞতা অর্জনের সময়।

এরপর বাকি বিকল্পগুলোর মধ্যে যে প্রথমটি আগের সবগুলোর চেয়ে ভালো মনে হবে, সেটিকেই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে যৌক্তিক

গণিতের ভাষায় এটি একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি ডেটিং ও সম্পর্ক নিয়েও আলোচনায় চলে এসেছে।

ডেটিংয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

ধরুন, আপনি ডেটিং শুরু করেছেন। প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হলো, তাকেই হয়তো নিখুঁত মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনার তো এখনও জানা নেই, আপনার জন্য কী ধরনের মানুষ সবচেয়ে উপযুক্ত।

৩৭ শতাংশ রুলের সমর্থকরা বলেন, সম্পর্কের শুরুতে কিছু সময় শুধু শেখার জন্য রাখা দরকার। এই সময়টাতে মানুষ শুধু অন্যদেরই চেনে না, নিজেকেও চেনে।

কী ধরনের মানুষের সঙ্গে তার মানসিক মিল হয়, কোন বিষয়গুলো তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কোন আচরণ মেনে নেওয়া কঠিন—এসব বোঝার জন্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

অর্থাৎ তত্ত্বটির মূল কথা হলো, জীবনসঙ্গী খোঁজার আগে নিজের প্রত্যাশাগুলোকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া।

তাহলে কি প্রেমও একটি হিসাব?

এখানেই শুরু হয় বিতর্ক। কারণ বাস্তব জীবন গণিতের প্রশ্নপত্র নয়। মানুষ কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যার বিকল্পও নয়।

ধরা যাক, আপনার জীবনের সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ৩৭ শতাংশের অনেক আগেই। তখন কি শুধু নিয়ম মেনে তাকে হারাতে দেবেন?

আবার এমনও হতে পারে, যাকে আপনি খুঁজছেন, তিনি জীবনের অনেক পরে এসে হাজির হবেন।

সমস্যা হলো, বাস্তব জীবনে কেউ জানে না তার সামনে মোট কতজন সম্ভাব্য সঙ্গী আসবেন। তাই ৩৭ শতাংশ হিসাব করাও সহজ নয়।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো, মানুষ বদলায়।

২০ বছর বয়সে যে বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, ৩০ বছর বয়সে সেগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ নাও থাকতে পারে।

ক্যারিয়ার, জীবনবোধ, দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা—সবকিছুই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ফলে জীবনের এক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো ভবিষ্যৎকে মাপা কঠিন।

এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ৩৭ শতাংশ রুলকে আক্ষরিক অর্থে অনুসরণ করার চেষ্টা করা ভুল হবে।

তাহলে এই তত্ত্বের মূল্য কোথায়?

আসলে ৩৭ শতাংশ রুলের সবচেয়ে বড় শক্তি সংখ্যাটিতে নয়, এর বার্তায়।

এটি মনে করিয়ে দেয় যে, খুব দ্রুত সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে আজীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তেমনি সারাজীবন ‘হয়তো আরও ভালো কেউ আসবে’ ভেবে অপেক্ষা করাও সমস্যার।

অনেক মানুষ সম্পর্ক নষ্ট করেন কারণ তারা খুব তাড়াহুড়া করেন। আবার অনেক মানুষ ভালো সম্পর্ক হারান কারণ তারা কখনও সিদ্ধান্তই নিতে পারেন না।

৩৭ শতাংশ রুল এই দুই চরম অবস্থার মাঝামাঝি একটি ভারসাম্যের কথা বলে।

শেষ কথা

ভালোবাসার কোনও নির্ভুল সূত্র নেই। এমন কোনও সমীকরণও নেই, যেখানে কিছু সংখ্যা বসিয়ে বলে দেওয়া যাবে—এই মানুষটিই আপনার জীবনসঙ্গী।

তবু ডেটিংয়ের ৩৭ শতাংশ রুল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়; সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করুন, কিন্তু নিখুঁত মানুষের অপেক্ষায় জীবনকে অনন্তকাল ঝুলিয়েও রাখবেন না।

কারণ অনেক সময় সুখী সম্পর্কের রহস্য ‘সবচেয়ে ভালো’ মানুষকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যে নয়; বরং সঠিক সময়ে একজন যথেষ্ট ভালো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।