শরীর নিয়ে অস্বস্তি বাড়াচ্ছে তারকাদের ছবি?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে কোনও অভিনেত্রী বা মডেলের আগের-পরের ছবি। কোথাও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, হঠাৎ এত ওজন কমল কীভাবে? কোথাও আলোচনা, কোনো ওষুধের প্রভাবে কি এমন পরিবর্তন? আবার কোথাও বলা হচ্ছে, চিকন হওয়ার এই প্রবণতা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।

উদ্দেশ্য হয়তো সচেতনতা তৈরি করা। কিন্তু সেই সচেতনতার চেষ্টাই কি উল্টো মানুষের শরীর নিয়ে অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, উত্তরটি অনেক ক্ষেত্রেই 'হ্যাঁ'।

সমস্যা নিয়ে কথা বলা জরুরি, কিন্তু ছবি কি জরুরি?

শরীর নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বা 'বডি ইমেজ' এখন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। গবেষণায় বহুবার দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগা শরীরকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা ছবি বারবার দেখলে নারী-পুরুষ—উভয়ের মধ্যেই নিজের শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে।

তাই এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচনা করতে গিয়ে যদি বারবার সেই একই ধরনের 'আদর্শ' শরীরের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সচেতনতার বদলে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।

বারবার দেখা মানেই স্বাভাবিক মনে হওয়া

মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত জিনিসকে সহজেই স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে 'মিয়ার এক্সপোজার' প্রভাব বলা হয়।

একই ধরনের অতিরিক্ত রোগা শরীরের ছবি যদি প্রতিদিন নিউজফিডে ভেসে ওঠে, তাহলে ধীরে ধীরে সেটিই যেন 'স্বাভাবিক' শরীরের মানদণ্ড বলে মনে হতে পারে। তখন আয়নায় নিজের শরীর দেখেই অনেকের মনে হতে পারে, আমি যেন ঠিক তেমন নই।

এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নিতে পারে শরীর নিয়ে অস্বস্তি, আত্মসন্দেহ কিংবা নিজেকে বদলে ফেলার তীব্র চাপ।

ছবির নিচের সতর্কবার্তা সব সময় কাজ করে না

অনেকে মনে করেন, ছবির সঙ্গে যদি লেখা থাকে 'এটি ক্ষতিকর প্রবণতা' বা 'এভাবে রোগা হওয়া উচিত নয়', তাহলে সমস্যা কমে যায়।

কিন্তু গবেষণা বলছে, মানুষের চোখ প্রথমেই ছবির দিকে যায়। ছবিটি মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে। পরে লেখা ব্যাখ্যা যোগ হলেও সেই দৃশ্যমান প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায় না।

অর্থাৎ একটি ক্ষতিকর আদর্শের সমালোচনা করতে গিয়েও সেটিকেই আরও বেশি মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়া হতে পারে।

মিডিয়া যা চায়, আমরা কি সেটাই করছি?

অতিরিক্ত রোগা কোনও তারকার ছবি প্রকাশের পর সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। কে কী বললেন, কীভাবে ওজন কমালেন, দেখতে ভালো লাগছে কি না—এসব নিয়ে হাজারো মন্তব্য জমা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবেই অনিচ্ছাকৃতভাবে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার সেই কনটেন্ট আরও বেশি প্রচার পায়, যেখানে নারীর শরীরই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ সমালোচনা করলেও আমরা অনেক সময় সেই একই আলোচনাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলি।

নিজের জীবন থেকে কী হারাচ্ছি?

অন্যের শরীর নিয়ে যত বেশি সময় ব্যয় হয়, নিজের জীবন, সম্পর্ক, দক্ষতা কিংবা ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য তত কম সময় থাকে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন মানুষের পরিচয় শুধু তার শরীর নয়। কাজ, সৃজনশীলতা, সম্পর্ক, মূল্যবোধ, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়েই একজন মানুষ।

কিন্তু যদি দিনের বড় একটি অংশ অন্যের শরীর বিশ্লেষণ করতেই কেটে যায়, তাহলে নিজের পরিচয়ের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

আলোচনা হোক, ছবি নয়

বিশেষজ্ঞরা শরীর নিয়ে সামাজিক চাপ, সৌন্দর্যের অবাস্তব মানদণ্ড কিংবা ওজন নিয়ে বৈষম্য—এসব বিষয়ে আলোচনা বন্ধ করার কথা বলছেন না। বরং তারা বলছেন, আলোচনা আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।

তবে সেই আলোচনায় অতিরিক্ত চিকন শরীরের ছবিকে কেন্দ্রবিন্দুতে না আনাই ভালো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েন্সার, এমনকি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিও তাদের আহ্বান—যদি সত্যিই সুস্থ শরীর-ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চান, তাহলে 'শেয়ার' বাটনে চাপ দেওয়ার আগে আরেকবার ভাবুন।

কারণ কখনও কখনও একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। আর সেই প্রভাব সব সময় ইতিবাচক হয় না।