টেবিলে ভাত, ডাল, মাছ আর সবজি সাজানো। কিন্তু শিশুটি মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। অনেক বুঝিয়েও লাভ হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সে হয়তো বিস্কুট, পাস্তা বা একই ধরনের কয়েকটি খাবারই খেতে রাজি হলো।
এমন দৃশ্য অনেক পরিবারের কাছেই পরিচিত। বেশিরভাগ অভিভাবক তখন মনে করেন, সন্তানটি জেদ করছে। তাই কেউ বকেন, কেউ জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, আবার কেউ বলেন, "এক চামচ না খেলে টেবিল থেকে উঠতে পারবে না।"
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সময় বিষয়টি জিদের নয়। অনেক শিশুর বেছে বেছে খাওয়ার পেছনে কাজ করে উদ্বেগ, সংবেদনশীলতা বা নতুন খাবার নিয়ে অস্বস্তি। অর্থাৎ, বাইরে থেকে যা জিদ বলে মনে হয়, ভেতরে তা হতে পারে এক ধরনের মানসিক চাপ।
কেন নতুন খাবার এড়িয়ে চলে?
খাওয়া শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়। স্বাদ, গন্ধ, টেক্সচার, মুখের পেশির সমন্বয় এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে তবেই একটি শিশু নতুন খাবার গ্রহণ করতে শেখে।
কিছু শিশুর কাছে নতুন খাবারের গন্ধ, মুখে কেমন লাগবে বা স্বাদ কেমন হবে—এই অনিশ্চয়তাই ভয় তৈরি করে। তাই তারা এমন খাবারই বেছে নেয়, যেগুলোর স্বাদ, গন্ধ ও অনুভূতি প্রতিবার একই রকম থাকে।
এ কারণেই অনেক শিশু বিস্কুট, প্লেইন পাস্তা, চিকেন নাগেটস বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার পছন্দ করে। কারণ এসব খাবারে চমকে যাওয়ার মতো নতুন কিছু থাকে না।
অপরদিকে, একটি স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি বা গাজরের স্বাদ ও গঠন প্রতিবার এক রকম নাও হতে পারে। এই অনিশ্চয়তা সংবেদনশীল শিশুর কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জোরাজুরি কেন সমস্যাকে বাড়ায়?
সন্তানের ভালো চেয়েই অনেক অভিভাবক বলেন, "আর এক চামচ খাও", "এটা না খেলে মিষ্টি পাবে না" কিংবা "না খেয়ে উঠতে পারবে না।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব চাপ অনেক সময় উল্টো ফল দেয়।
যে খাবারটি শিশুর কাছে আগেই অস্বস্তির, সেটি জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করলে তার উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন নতুন খাবার সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হওয়ার বদলে শিশুটি আরও বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
একসময় খাওয়ার টেবিলই তার কাছে চাপ, ভয় ও অস্বস্তির জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। এতে শুধু শিশুই নয়, পুরো পরিবারের খাবারের সময়টাও অশান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তাহলে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্য শুধু শিশুকে নতুন খাবার খাওয়ানো নয়; বরং খাবারের সঙ্গে তার ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা।
সে জন্য শুরুতেই খাবার মুখে দেওয়ার চাপ না দিয়ে শিশুকে খাবার ছুঁয়ে দেখতে, গন্ধ নিতে, রান্নায় অংশ নিতে বা খাবার নিয়ে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
প্রথম দিন সে হয়তো শুধু গাজর হাতে নেবে। পরে সেটি শুঁকবে। এরপর জিভ দিয়ে ছুঁয়ে দেখবে। একসময় ছোট্ট একটি কামড়ও দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিটি ধাপই অগ্রগতি।
ঘরে বসেই যা করতে পারেন
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার ও নাশতা দিন।
- নতুন খাবারের সঙ্গে শিশুর পছন্দের একটি পরিচিত খাবারও পরিবেশন করুন।
- নতুন খাবার খেতে চাপ দেবেন না, সুযোগ তৈরি করুন।
- শুধু খাওয়াকে সাফল্য মনে করবেন না। খাবার ছোঁয়া, গন্ধ নেওয়া বা স্বাদ নেওয়াও ইতিবাচক অগ্রগতি।
- শিশুর ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার সংকেতকে সম্মান করুন।
- পরিবারের বড়রা নিজেরাও নতুন খাবার আনন্দের সঙ্গে খেয়ে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করুন।
শেষ কথা
শিশুর বেছে বেছে খাওয়ার অভ্যাস সব সময় অবাধ্যতা বা জিদের লক্ষণ নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে উদ্বেগ, সংবেদনশীলতা কিংবা নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে অস্বস্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধমক, জোরাজুরি বা শাস্তি নয়—ধৈর্য, ইতিবাচক পরিবেশ এবং চাপমুক্তভাবে নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই শিশুর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সবচেয়ে কার্যকর।
মনে রাখবেন, নতুন কোনও খাবার খাওয়ার সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি সব সময় প্রথম কামড় নয়; অনেক সময় সেই খাবারটিকে ভয় না পাওয়াই আসল অগ্রগতি।