বন্যা মোকাবিলায় পরিবারের সবার যেসব বিষয় জানা উচিত

বর্ষা এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দেয় বন্যার শঙ্কা। কোথাও টানা বৃষ্টি, কোথাও উজানের ঢল—মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে পারে বাড়িঘর, সড়ক ও ফসলি জমি। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্ক নয়, সবচেয়ে জরুরি হলো আগাম প্রস্তুতি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। সামান্য সচেতনতাই আপনার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ রাখতে পারে।

বন্যার আগেই প্রস্তুতি নিন

বন্যার সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তুতি শুরু করুন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আলোচনা করে ঠিক করুন, প্রয়োজন হলে কোথায় আশ্রয় নেবেন।

একটি জরুরি ব্যাগ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখুন। এতে রাখুন—

জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের জলরোধী কপি;

প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী;

শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ বা বোতলজাত পানি;

টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাংক;

কিছু নগদ টাকা;

শিশু, বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সদস্যদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী;

মোবাইল ফোন ও পাওয়ার ব্যাংক সম্পূর্ণ চার্জ করে রাখুন। জরুরি ফোন নম্বরগুলো কাগজে লিখেও সংরক্ষণ করতে পারেন।

পানি বাড়তে শুরু করলে যা করবেন

স্থানীয় প্রশাসন বা উদ্ধারকর্মীরা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলে দেরি করবেন না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িতে থাকার চেষ্টা অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে।

বাড়ি ছাড়ার আগে নিরাপদভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করুন। এতে অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

নৌকায় চলাচলের প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত যাত্রী উঠবেন না। লাইফ জ্যাকেট থাকলে অবশ্যই ব্যবহার করুন।

বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করুন

বন্যার সময় ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই—

পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করুন;

দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা বা খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন;

ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে ব্যবহার করুন;

শিশুদের খাবার তৈরিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।

বিদ্যুতের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকুন

বন্যার পানিতে ডুবে থাকা বৈদ্যুতিক তার, খুঁটি বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র স্পর্শ করবেন না;

ভেজা হাতে সুইচ ব্যবহার করবেন না। কোথাও ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার দেখলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।

সাপ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যাপারে সতর্ক থাকুন

বন্যার সময় সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে। ঘরে ঢোকার আগে টর্চ দিয়ে চারপাশ দেখে নিন। জুতা, কাপড় বা বিছানা ব্যবহারের আগে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। সাপ কামড়ালে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের দিকে বিশেষ নজর দিন

শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করুন। শিশুদের কখনো একা পানির কাছে যেতে দেবেন না।

যেসব ভুল একেবারেই করবেন না

অপ্রয়োজনে বন্যার পানিতে নামবেন না; স্রোত আছে এমন পানি পার হওয়ার চেষ্টা করবেন না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা যাচাইহীন তথ্য বিশ্বাস করবেন না; পানিতে ডুবে থাকা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করবেন না; শিশুদের একা রেখে কোথাও যাবেন না।

পানি নেমে গেলেও সতর্ক থাকুন

বন্যার পানি কমে গেলেই সব ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। বাড়িতে ফেরার আগে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। পানির ট্যাংক, নলকূপ ও রান্নাঘরের ব্যবহৃত সামগ্রী পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করুন।

জ্বর, ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে আগাম প্রস্তুতি, সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা এবং পরিবারের সবাইকে সচেতন রাখার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়।

নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিবেশী, শিশু, বয়স্ক ও অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করুন। দুর্যোগের সময়ে পারস্পরিক সহমর্মিতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।