একটি শিশু হয়তো কোনও বিষয় নিয়ে অনর্গল কথা বলতে পারে। কিন্তু একই বিষয় লিখতে বললেই আটকে যায়। বারবার লেখা শুরু করে, কেটে দেয়, আবার চেষ্টা করে—শেষ পর্যন্ত হয়তো কয়েকটি বাক্যও লিখতে পারে না। অনেক সময় এমন সমস্যাকে শিশুর অলসতা, অমনোযোগ বা শুধু হাতের লেখা খারাপ হওয়ার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। তবে এর পেছনে থাকতে পারে ডিসগ্রাফিয়া নামের একটি শেখার সমস্যা।
ডিসগ্রাফিয়া শুধু হাতের লেখা খারাপ হওয়ার বিষয় নয়। বয়স ও শেখার সুযোগ অনুযায়ী প্রত্যাশিত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও চিন্তা ও ভাষাকে লিখিত রূপে প্রকাশ করতে শিশুর যে স্থায়ী বা উল্লেখযোগ্য অসুবিধা হয়, তার সঙ্গে ডিসগ্রাফিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কথা বলা ও লেখা—দুটিই ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও লেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে হয়। ভাবনাকে শব্দে, শব্দকে অক্ষরে এবং সেগুলোকে বাক্যে রূপ দিতে হয়। এর পাশাপাশি স্মৃতি, মনোযোগ, সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা, পরিকল্পনা ও অন্যান্য নির্বাহী কার্যক্রমও সমন্বিতভাবে কাজ করে।
এই প্রক্রিয়ার কোনও একটি অংশে সমস্যা থাকলেও শিশুর লেখার দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে বদলে যেতে পারে লক্ষণ
ডিসগ্রাফিয়ার লক্ষণ সব বয়সে একরকম থাকে না। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অক্ষর বা শব্দ কপি করতে সমস্যা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বানান ঠিক রাখা, বাক্য গঠন, নোট নেওয়া কিংবা নিজের ভাবনা গুছিয়ে লিখতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কেউ হয়তো অক্ষর লিখতে পারে ঠিকই, কিন্তু কয়েকটি বাক্য লিখে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে গিয়ে আটকে যায়। আবার কারও ক্ষেত্রে শব্দের বানান মনে রাখা বা দ্রুত লিখতে গিয়ে সমস্যা বেশি দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু হাতের লেখা দেখে কোনো শিশুর ডিসগ্রাফিয়া আছে কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না।
হাতের লেখা খারাপ হলেই ডিসগ্রাফিয়া নয়
ডিসগ্রাফিয়ার সঙ্গে দুর্বল বা অস্পষ্ট হাতের লেখা থাকতে পারে। তবে হাতের লেখা খারাপ হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। কারও সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতার সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে শব্দ বা বানান মনে রাখার সমস্যা লেখার গতি ও হাতের লেখাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধরা যাক, একটি শিশুকে একটি শব্দের প্রতিটি অক্ষর আলাদাভাবে মনে রেখে লিখতে হচ্ছে। এতে তার মানসিক মনোযোগের বড় অংশ চলে যেতে পারে শব্দটি ঠিকভাবে লেখার পেছনে। ফলে অক্ষরের আকার, শব্দের মাঝের ফাঁক কিংবা লাইনে ঠিকভাবে লেখার মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ডিসগ্রাফিয়ার সঙ্গে ডিসলেক্সিয়ার সম্পর্ক
লেখার সমস্যা ও পড়ার সমস্যার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। লেখায় সমস্যায় থাকা অনেক শিশুর পড়ার ক্ষেত্রেও অসুবিধা থাকতে পারে। আবার পড়ার সমস্যায় থাকা শিশুর লেখাতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কারণ পড়া ও লেখা—দুটির ক্ষেত্রেই ভাষা প্রক্রিয়াকরণের কিছু অভিন্ন দক্ষতা প্রয়োজন। তবে লেখার সময় শিশুকে শুধু ভাষা বুঝলেই হয় না; নিজের চিন্তাকে সংগঠিত করে সেটিকে লিখিত ভাষায় প্রকাশ করতে হয়। ফলে অনেক শিশুর কাছে লেখা পড়ার চেয়েও বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শুধু বাড়তি সময় দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না
লেখায় সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়তি সময় দেওয়া, ছোট অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া, কম লিখতে বলা কিংবা মৌখিকভাবে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দেওয়া তাদের পড়াশোনার চাপ কমাতে পারে। এগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা হতে পারে।
তবে এসব ব্যবস্থা মূল সমস্যার সমাধান করে না। এগুলো শিশুকে সমস্যাটি সামলে চলতে সাহায্য করে, কিন্তু কেন লেখা কঠিন হচ্ছে—সেই কারণটি দূর করে না।
তাই শিশুর লেখার সমস্যার ধরন ও কারণ বোঝার জন্য যথাযথ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে ভাষা, শেখার দক্ষতা, মোটর দক্ষতা, মনোযোগ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
শিশুকে ‘অলস’ বা ‘অমনোযোগী’ বলার আগে
লেখার সময় কোনও শিশু বারবার আটকে গেলে তাকে অলস, অমনোযোগী বা চেষ্টা করতে অনিচ্ছুক হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ। কিন্তু বাস্তবে সে হয়তো এমন একটি কাজ করার চেষ্টা করছে, যা তার জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রমের।
তাই একই নির্দেশনা বারবার দেওয়ার বদলে শিশুটি ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছে, সেটি বোঝা জরুরি। শুধু সুন্দর হাতের লেখা নয়—শব্দের বানান, বাক্য গঠন, ভাবনা সাজানো, লেখা শুরু করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজের কথা প্রকাশ করতে পারছে কিনা, সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
ডিসগ্রাফিয়ার মতো লেখার সমস্যাকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া তার পড়াশোনার অভিজ্ঞতাকে অনেক সহজ করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, লেখার সমস্যাকে শিশুর মেধা, আগ্রহ বা পরিশ্রমের অভাব হিসেবে না দেখে এর পেছনের কারণটি বোঝার চেষ্টা করা।