বন্ধু, পরিবার কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটালে তাদের অনেক অভ্যাস অজান্তেই আমাদের মধ্যে চলে আসে। একই ধরনের খাবার খাওয়া, একই জায়গায় যাওয়া কিংবা একই রকম জীবনযাপন—এসবের মাধ্যমে কাছের মানুষদের মধ্যে নানা ধরনের মিল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু এই মিল কি শুধু আচরণ আর অভ্যাসেই সীমাবদ্ধ?
নতুন এক গবেষণা বলছে, সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে মানুষের অন্ত্রের জীবাণুরও একটি যোগসূত্র থাকতে পারে। ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত মানুষের মধ্যে অন্ত্রের কিছু জীবাণুর একই স্ট্রেইন ভাগাভাগি করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। এমনকি পরিবারের বাইরে থাকা বন্ধু ও পরিচিত মানুষের মধ্যেও এই মিল পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বন্ধুর সঙ্গে মিশলেই তার জীবাণু আপনার শরীরে গিয়ে আপনার ব্যক্তিত্ব বা আচরণ বদলে দেবে। গবেষণাটি এমন কোনও কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করেনি। বরং মানুষের সামাজিক নেটওয়ার্ক ও অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের মধ্যে সম্ভাব্য একটি জৈবিক যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছে।
১৮ গ্রামের মানুষের ওপর গবেষণা
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘ন্যাচার’ জার্নালে। গবেষকেরা হন্ডুরাসের ১৮টি তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন গ্রামের ১ হাজার ৭৮৭ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর গবেষণা করেন।
প্রথমে তারা গ্রামের মানুষের সামাজিক সম্পর্কের একটি বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেন। কে কার বন্ধু, কার সঙ্গে অবসর সময় কাটান, কার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং কারা পরিবারের সদস্য—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এরপর অংশগ্রহণকারীদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা শুধু কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তা দেখেননি; আরও সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন পর্যায়েও মিল খুঁজেছেন।
ফলাফলে দেখা যায়, যাদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে, একই গ্রামের কিন্তু সামাজিকভাবে সম্পর্কহীন মানুষের তুলনায় তাদের মধ্যে কিছু জীবাণুর একই স্ট্রেইন ভাগাভাগির হার বেশি।
এই মিল শুধু স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান বা ভাইবোনের মধ্যেই দেখা যায়নি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং একই পরিবারের বাইরে থাকা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এমন মিল পাওয়া গেছে।
যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তত বেশি মিল
গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগের মাত্রার সঙ্গেও মাইক্রোবায়োমের মিলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যেসব মানুষ একসঙ্গে বেশি সময় কাটাতেন বা নিয়মিত খাবার ভাগ করে নিতেন, তাদের মধ্যে জীবাণুর একই স্ট্রেইন ভাগাভাগির হারও তুলনামূলক বেশি ছিল। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ যত ঘনিষ্ঠ, মাইক্রোবায়োমের কিছু মিলও তত বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
আরও আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রভাব শুধু সরাসরি বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষকেরা দ্বিতীয় স্তরের সামাজিক সম্পর্কেও—অর্থাৎ বন্ধুদের বন্ধু কিংবা সামাজিক নেটওয়ার্কের আরও দূরের সংযোগে—কিছু স্ট্রেইন ভাগাভাগির প্রমাণ পেয়েছেন।
তাহলে কি মানুষ একে অন্যের ব্যাকটেরিয়া বদলে দেয়?
এখানেই গবেষণাটিকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে।
গবেষণায় সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে মাইক্রোবায়োমের মিল পাওয়া গেছে। কিন্তু শুধু এই ফলাফল থেকে বলা যায় না যে একজন ব্যক্তি আরেকজনের মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন করেছেন।
কারণ একই ধরনের খাবার খাওয়া, একই পরিবেশে থাকা, একই ধরনের জীবনযাপন কিংবা একই স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতিও এই মিলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে গবেষকেরা এসব সম্ভাব্য বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে জীবাণুর একই স্ট্রেইন ভাগাভাগির সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাইক্রোবায়োমের মিল তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে—এমন সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
দুই বছর পরেও মিলের ইঙ্গিত
গবেষণাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ।
১৮টি গ্রামের মধ্যে চারটি গ্রামের ৩০১ জনকে প্রায় দুই বছর পর আবার পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, সামাজিকভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সময়ের সঙ্গে মাইক্রোবায়োমের স্ট্রেইন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে আরও বেশি মিল তৈরি হয়েছে। অপরদিকে, একই ধরনের কিন্তু সামাজিকভাবে সংযুক্ত নয়—এমন মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল।
এই ফলাফল সামাজিক সম্পর্ক ও মাইক্রোবায়োমের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্রকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে এটিও কারণ-ফল সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, সামাজিকভাবে যুক্ত থাকা এবং মাইক্রোবায়োমের মিল—এই দুই বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অন্ত্রের জীবাণু নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
মানুষের অন্ত্রে বিপুলসংখ্যক অণুজীব বসবাস করে। এগুলোকে সম্মিলিতভাবে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বলা হয়।
মাইক্রোবায়োম খাবার হজম, বিপাকক্রিয়া ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যেও দ্বিমুখী যোগাযোগ রয়েছে, যাকে বলা হয় গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস।
এই কারণে বিজ্ঞানীরা এখন জানতে চাইছেন, অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তন মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। মাইক্রোবায়োমের কোনো একটি ব্যাকটেরিয়া মানুষের মেজাজ, বুদ্ধিমত্তা বা ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
আপনার বন্ধুর কারণে কি আপনার আচরণ বদলাচ্ছে?
সামাজিক সম্পর্ক মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলে—এটি প্রতিষ্ঠিত বিষয়। আমরা যাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাই, তাদের কাছ থেকে অনেক অভ্যাস ও আচরণ শিখতে পারি।
কিন্তু নতুন গবেষণাটি এর সঙ্গে আরেকটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে—সামাজিক সম্পর্কের প্রভাব হয়তো শরীরের অণুজীবজগতের সঙ্গেও যুক্ত।
এর মানে অবশ্যই এই নয় যে ‘খারাপ বন্ধু’ আপনার পেটের ব্যাকটেরিয়া বদলে দেবে কিংবা ‘ভালো বন্ধু’ মাইক্রোবায়োম ঠিক করে দেবে।
গবেষণার বার্তা বরং আরও সূক্ষ্ম।
আমরা সামাজিক প্রাণী। একে অন্যের সঙ্গে মিশে আমরা শুধু কথা, অভ্যাস ও অভিজ্ঞতাই ভাগ করে নিই না; আমাদের শরীরের অণুজীবের জগতেও সেই সামাজিক যোগাযোগের কিছু ছাপ থাকতে পারে।
এখন বিজ্ঞানীদের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—এই মাইক্রোবায়োমের মিল কীভাবে তৈরি হয়, এর পেছনে সরাসরি জীবাণু স্থানান্তর, পরিবেশ নাকি জীবনযাপনের প্রভাব কতটা এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কোনো স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব আছে কি না।
সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—মানুষের সামাজিক জীবন আর শরীরের জীবাণুজগতকে হয়তো এতটা আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; তাদের সম্পর্ক তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।