সন্তান হঠাৎ খাবার নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে? কিছু খাবার একেবারেই খেতে চাইছে না, খাবার এড়িয়ে যাচ্ছে, খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বা ভয় প্রকাশ করছে, কিংবা খাবার নিয়ে আগের চেয়ে বেশি গোপনীয় হয়ে উঠেছে? অনেক অভিভাবক এসব আচরণকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা ‘খুঁতখুঁতে স্বভাব’ বলে ধরে নেন।
কিন্তু আচরণগুলো যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সন্তানের শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
ইটিং ডিসঅর্ডার বা খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যা শুধু খাবার নিয়ে অনীহার বিষয় নয়। এটি এমন একটি জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যার প্রভাব একজন শিশুর চিন্তা, আবেগ, আচরণ, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সম্পর্কেও পড়তে পারে।
তাই সন্তানের আচরণকে শুধু ‘জেদ’ বা ‘খুঁতখুঁতে স্বভাব’ হিসেবে দেখার বদলে এর পেছনে কোন্র সমস্যা আছে কি না, সেটি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
শুধু শিশুর নয়, পুরো পরিবারের জন্য কঠিন সময়
‘মাই চাইল্ড হ্যাজ অ্যান ইটিং ডিসঅর্ডার’ বইয়ের পর্যালোচনায় মনোবিজ্ঞানী মনিকা ভিলহাওয়ার দেখিয়েছেন, সন্তানের ইটিং ডিসঅর্ডার শুধু তার নিজের জীবনেই প্রভাব ফেলে না; পুরো পরিবারকেও এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
একজন অভিভাবকের জন্য সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হতে পারে, নিজের সন্তানকে আগের মতো মনে না হওয়া। সমস্যার কারণে শিশুর মধ্যে গোপনীয়তা, বিরক্তি, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কিংবা খাবার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
এ সময় বাবা-মায়ের মনে হতে পারে, সন্তান ইচ্ছা করেই এমন আচরণ করছে। কিন্তু সমস্যাটিকে ‘ইচ্ছাকৃত আচরণ’ হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বরং শিশুটি কী ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
ইটিং ডিসঅর্ডার মানেই রোগা হওয়ার চেষ্টা নয়
ইটিং ডিসঅর্ডার সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, এটি শুধু ওজন কমানো বা অতিরিক্ত রোগা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা, বুলিমিয়া নার্ভোসা, বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার এবং এআরএফআইডি’সহ বিভিন্ন ধরনের ফিডিং ও ইটিং ডিসঅর্ডার রয়েছে। প্রতিটির কারণ ও প্রকাশভঙ্গিও এক নয়।
বিশেষ করে এআরএফআইডির ক্ষেত্রে শরীরের ওজন বা আকৃতি নিয়ে উদ্বেগ না থাকলেও খাবার এড়িয়ে চলা বা খাবারের প্রতি তীব্র অনীহা দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক গঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের মানুষের মধ্যেই দেখা যেতে পারে। তাই শুধু শিশুর চেহারা বা ওজন দেখে ইটিং ডিসঅর্ডার আছে কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না।
আচরণের পরিবর্তন আগে চোখে পড়তে পারে
ইটিং ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে সব সময় প্রথমেই বড় ধরনের শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায় না। অনেক সময় আচরণ ও আবেগের পরিবর্তনই আগে নজরে আসে।
যেমন— খাবার নিয়ে অস্বাভাবিক উদ্বেগ বা ভয়; নিয়মিত খাবার এড়িয়ে যাওয়া; খাবার বা খাওয়ার সময় নিয়ে অতিরিক্ত গোপনীয়তা; নির্দিষ্ট ধরনের খাবার নিয়ে অস্বাভাবিক ভয় বা অনীহা; খাবারের পর অস্বাভাবিক আচরণ; শরীরের ওজন বা আকৃতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ; খিটখিটে মেজাজ বা আচরণগত পরিবর্তন; বন্ধু বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।
তবে এসব লক্ষণের এক বা একাধিকটি থাকলেই যে শিশুর ইটিং ডিসঅর্ডার হয়েছে, তা নয়। একই ধরনের আচরণের পেছনে অন্য শারীরিক বা মানসিক কারণও থাকতে পারে।
তবে পরিবর্তনগুলো যদি ধারাবাহিক হয়, বাড়তে থাকে কিংবা শিশুর দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
শুধু ওজন দেখলে ভুল হতে পারে
সন্তানের ইটিং ডিসঅর্ডার বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ওজন বা শারীরিক গঠনের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়।
কিছু ইটিং ডিসঅর্ডারে ওজন দ্রুত কমতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে শিশুর ওজন বাইরে থেকে স্বাভাবিকও মনে হতে পারে। ফলে ‘দেখতে তো স্বাভাবিকই আছে’—এমন ধারণা থেকে সমস্যাটিকে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
শিশুর খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক, আচরণ, মানসিক অবস্থা, শারীরিক পরিবর্তন এবং স্কুল ও সামাজিক জীবনে এর প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি দেখতে হয়।
কেন এমন হচ্ছে?
ইটিং ডিসঅর্ডারের পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। জিনগত ও জৈবিক বিষয়, মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক চাপ এবং শরীর ও খাবার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ধারণা—সবই ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সন্তান এমন আচরণ করছে মানেই বাবা-মায়ের কোনো ভুল হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া ঠিক নয়।
বরং সমস্যার কারণ বোঝার জন্য প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সন্তানকে চাপ নয়, বোঝার চেষ্টা
সন্তান খেতে না চাইলে অনেক বাবা-মা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু খাবার নিয়ে ক্রমাগত চাপ, বকাঝকা বা শাস্তি সব সময় সমস্যার সমাধান করে না।
‘কেন খাচ্ছ না?’ বা ‘এতটুকুও খেতে পারছ না?’—এ ধরনের মন্তব্যের বদলে শিশুর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
অভিভাবক বলতে পারেন, ‘তোমার খাবার নিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে মনে হচ্ছে। কী কারণে এমন লাগছে, সেটা কি আমার সঙ্গে বলতে চাও?’
শিশু কথা বলতে না চাইলে জোর না করে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই ভালো।
বাবা-মায়েরও সহায়তা দরকার
সন্তানের ইটিং ডিসঅর্ডারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অভিভাবকেরাও প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়তে পারেন। ভয়, অপরাধবোধ, রাগ, অসহায়ত্ব কিংবা একাকিত্ব—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তাই শুধু শিশুর চিকিৎসা নয়, বাবা-মায়ের মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কিংবা সহায়তা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া যেতে পারে।
সন্তানের পাশে থাকার জন্য অভিভাবকের নিজের মানসিকভাবে সুস্থ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ হয়ে ওঠার পথ সব সময় একরকম নয়
ইটিং ডিসঅর্ডার থেকে পুনরুদ্ধার সম্ভব। তবে সবার ক্ষেত্রে সেই পথ এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি হতে পারে, আবার কারও দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে।
মাঝে বাধা আসতে পারে, অগ্রগতি ধীর হতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো সমস্যাও ফিরে আসতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ হয়ে ওঠার অর্থ শুধু স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারা নয়। খাবার, শরীর ও নিজের প্রতি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক তৈরি করা এবং ইটিং ডিসঅর্ডারের বাইরে স্বাভাবিক ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপনও এর অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুর আচরণকে তার চরিত্রের সমস্যা বা ‘জেদ’ হিসেবে না দেখা। ইটিং ডিসঅর্ডার একটি জটিল স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং এর জন্য যথাযথ সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই সন্তান খেতে চাইছে না দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে ‘খুঁতখুঁতে স্বভাব’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।
সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
কারণ সময়মতো সমস্যা শনাক্ত করা গেলে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা শুরু করা সহজ হয়। পথটা সব সময় সহজ না হলেও পুনরুদ্ধারের সুযোগ আছে—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা।