একটা মেসেজের অপেক্ষায় বারবার ফোন দেখছেন। সে অনলাইনে এসেছে কি না, শেষ কখন সক্রিয় ছিল—সেটাও খেয়াল করছেন। উত্তর দিতে একটু দেরি হলেই মনে হচ্ছে, কিছু একটা হয়েছে। অথচ তার কাছ থেকে একটা ছোট্ট মেসেজ এলেই মুহূর্তে মন ভালো হয়ে যাচ্ছে।
কাজের মধ্যে হঠাৎ তার কথা মনে পড়ছে। পুরোনো কথোপকথন বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। তার বলা একটা সাধারণ কথার মধ্যেও খুঁজছেন বিশেষ কোনো ইঙ্গিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি, পোস্ট কিংবা মন্তব্য দেখছেন বারবার। এমনকি ভবিষ্যতে দুজনকে নিয়ে কী হতে পারে, সেই কল্পনাও থামছে না।
শুনতে প্রেমের মতোই লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিই প্রেম, নাকি এমন এক মানসিক টান, যেখান থেকে নিজেকেই বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে?
মনোবিজ্ঞানে এমন এক ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়, যেখানে একজন নির্দিষ্ট মানুষকে ঘিরে চিন্তা, কল্পনা, আকর্ষণ ও প্রত্যাশা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এই অভিজ্ঞতাকে বলা হয় লিমেরেন্স।
তবে শুরুতেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—লিমেরেন্স মানেই প্রেম নয়, আবার কাউকে খুব ভালো লাগলেই সেটিকে লিমেরেন্স বলাও ঠিক নয়। আসল বিষয় হলো অনুভূতিটির তীব্রতা, স্থায়িত্ব, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব।
ভালো লাগা কখন ‘বেশি ভালো লাগা’ হয়ে যায়?
কাউকে পছন্দ হলে তার কথা মনে পড়বে, তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করবে, মেসেজ এলে ভালো লাগবে—এটাই স্বাভাবিক। নতুন প্রেমে এই অনুভূতি আরও তীব্র হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
সমস্যা তৈরি হতে পারে তখন, যখন মানুষটির কথা আর শুধু মনে পড়ে না; বরং মাথার ভেতর থেকে বেরই হতে চায় না।
আপনি অন্য কাজে মন দিতে চাইছেন, কিন্তু বারবার তার কথাই মনে আসছে। অফিসের কাজ করতে গিয়ে তার সঙ্গে হওয়া পুরোনো কথোপকথন মনে পড়ছে। পড়তে বসে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন। ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ভাবছেন, আজ কেন সে এমন আচরণ করল।
একসময় হয়তো বুঝতে পারছেন, দিনের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে একজন মানুষকে ঘিরে চিন্তা করতেই।
লিমেরেন্সের ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী চিন্তা, আবেগের দ্রুত ওঠানামা, মানুষটিকে অতিরিক্ত আদর্শায়ন এবং তার কাছ থেকে ভালোবাসার নিশ্চয়তা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা যেতে পারে।
একটা মেসেজ কেন পুরো মেজাজ বদলে দেয়?
লিমেরেন্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অনিশ্চয়তা।
সে কি আমাকে পছন্দ করে? আমার কথাটা কি তার ভালো লেগেছে? আজ এতক্ষণ কথা বলল কেন? কাল এত আগ্রহ দেখিয়ে আজ চুপ কেন? উত্তর দিতে এত দেরি করছে কেন?
এই প্রশ্নগুলোই অনেক সময় অনুভূতিটাকে আরও তীব্র করে তোলে।
একটা মেসেজ এলো—মনে হলো সব ঠিক আছে। একটু বেশি সময় কথা হলো—মনে হলো সম্পর্কটা এবার হয়তো এগোচ্ছে। আবার উত্তর দিতে দেরি হলো—মনে হতে পারে, নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে।
এভাবে অন্য একজনের আচরণ ধীরে ধীরে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করতে পারে।
আজ সে ভালোভাবে কথা বলেছে, তাই আপনার দিনটা ভালো। কাল সে দূরত্ব রেখেছে, তাই আপনার মন খারাপ। অর্থাৎ নিজের আবেগের রিমোট কন্ট্রোলটা যেন অন্য একজনের হাতে চলে গেছে।
বাস্তব মানুষ, নাকি মনের ভেতর বানানো মানুষ?
লিমেরেন্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আদর্শায়ন।
যে মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, তার ভালো দিকগুলোই হয়তো বেশি চোখে পড়ছে। তার সীমাবদ্ধতা, ভুল কিংবা এমন আচরণ, যা অন্য সময়ে আপনার বিরক্তির কারণ হতে পারত—সেগুলোও সহজেই উপেক্ষা করছেন।
কারণ বাস্তব মানুষটির পাশাপাশি আপনার মাথার ভেতর তার আরেকটি সংস্করণ তৈরি হয়ে যেতে পারে।
বাস্তবে হয়তো মানুষটি আপনার সঙ্গে দিনে এক ঘণ্টা কথা বলেন। কিন্তু আপনার কল্পনায় তিনি সারাদিন উপস্থিত। আপনি ভাবছেন, ভবিষ্যতে কী হতে পারে, সম্পর্কটা কোথায় যেতে পারে, সে আপনাকে আসলে কতটা ভালোবাসে, একদিন দুজন একসঙ্গে থাকলে জীবনটা কেমন হবে।
অর্থাৎ বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে সম্ভাবনার জগৎ।
আর তখন আপনি হয়তো মানুষটিকে যতটা না ভালোবাসছেন, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসছেন তাকে ঘিরে নিজের তৈরি করা গল্পটিকে।
প্রেম আর লিমেরেন্স—পার্থক্যটা কোথায়?
প্রেমও তীব্র হতে পারে। প্রিয় মানুষটির কথা সারাদিন মনে পড়তে পারে। তার জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগতে পারে। ভবিষ্যৎ নিয়েও স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক।
তবে সুস্থ ভালোবাসা সাধারণত সময়ের সঙ্গে একটা স্থিরতার দিকে এগোয়। দুজনের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়, সম্পর্কের বাস্তবতা পরিষ্কার হয়, নিরাপত্তাবোধ বাড়ে। মানুষটিকে তার ভালো-মন্দসহ দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
লিমেরেন্সের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মানুষটি কাছে এলে তীব্র আনন্দ, দূরে গেলে অস্থিরতা। তার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য মনোযোগও বিশাল অর্থ বহন করতে শুরু করে। আবার সামান্য অবহেলাও ভেঙে দিতে পারে পুরো দিন।
ফলে সম্পর্কের বাস্তবতার চেয়ে ‘হয়তো একদিন’ ধরনের সম্ভাবনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই লিমেরেন্সকে শুধু ‘প্রেমটা একটু বেশি তীব্র’ বলা যথেষ্ট নয়।
তাহলে কি প্রেমকেও রোগ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে?
এখানেই আসে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
মানুষের স্বাভাবিক প্রেম, আকর্ষণ কিংবা কারও জন্য তীব্র আকুলতাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখার ঝুঁকি আছে—এমন আপত্তি রয়েছে। আর এই আপত্তি পুরোপুরি অমূলকও নয়।
কারণ প্রেম কোনX রোগ নয়। কাউকে পছন্দ করা, তার কথা ভেবে উত্তেজিত হওয়া, তার কাছ থেকে মনোযোগ পেলে আনন্দ পাওয়া—এসব মানুষের স্বাভাবিক আবেগ।
তবে মনোবিজ্ঞানের আলোচনাটা অন্য জায়গায়।
দুঃখ স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু সেই দুঃখ যদি দীর্ঘদিন থাকে এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, তখন সেটি আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়ার মতো বিষয় হয়ে ওঠে। উদ্বেগও স্বাভাবিক। কিন্তু উদ্বেগ যদি অতিরিক্ত হয়ে জীবনযাত্রায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে, তখন সেটিও সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লিমেরেন্সের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে। অনুভূতিটা নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হতে পারে তার তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং জীবনের ওপর প্রভাব।
‘ভুলে যাও’ বললেই কি কাউকে ভুলে যাওয়া যায়?
কাউকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবছেন শুনলে আশপাশের মানুষ খুব সহজেই বলে দেন—‘ওকে ভুলে যাও’, ‘নিজের কাজে মন দাও’, ‘এত ভাবছ কেন?’
কথাগুলো বলা সহজ। কিন্তু যার মাথার ভেতর চিন্তাগুলো ঘুরছে, তার জন্য বিষয়টি এত সহজ নাও হতে পারে।
কারণ লিমেরেন্সের ক্ষেত্রে চিন্তাগুলো অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেই ফিরে আসে। আপনি হয়তো নিজেই চাইছেন না মানুষটির কথা ভাবতে, কিন্তু তবুও মনে পড়ছে। নিজের অজান্তেই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে ফেলছেন, পুরোনো ছবি দেখছেন কিংবা আগের কথোপকথন মনে করছেন।
মনোবিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সাইকোলজি টুডেতে লেখক অরলি মিলার তার পেশাগত অভিজ্ঞতায় এমন মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর এই অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিলেন। অনেকেই প্রথমবার ‘লিমেরেন্স’ শব্দটি জানার পর স্বস্তি পেয়েছেন। কারণ তারা বুঝতে পেরেছেন, তাদের অভিজ্ঞতার একটি নাম আছে এবং তারা একা নন।
লিমেরেন্স কি মানসিক রোগ?
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। লিমেরেন্সকে বর্তমানে স্বীকৃত আলাদা মানসিক রোগ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে কয়েকজন গবেষক এটিকে স্বাভাবিক প্রেম বা আকর্ষণ থেকে আলাদা একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
১৯৭৯ সালে মনোবিজ্ঞানী ডরোথি টেনভ ‘লিমেরেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী গবেষণায় এর সঙ্গে অতিরিক্ত চিন্তা, আবেশ, মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আসক্তির মতো আচরণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে কাউকে নিয়ে বেশি ভাবলেই যে লিমেরেন্স হয়েছে, এমনটা নয়।
বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে দেখতে হবে—অনুভূতিটি কতদিন ধরে চলছে, কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
নিজের অনুভূতি বোঝার কয়েকটি প্রশ্ন
কাউকে নিয়ে আপনার অনুভূতিটা স্বাভাবিক আকর্ষণ, নাকি আরও জটিল কিছু—তা বুঝতে নিজেকেই কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন।
দিনের বড় একটা সময় কি ওই মানুষটির কথা ভেবে কেটে যাচ্ছে? তার মেসেজ বা আচরণের ওপর কি আপনার মেজাজ অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে? কাজ, পড়াশোনা, ঘুম কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
তার বাস্তব আচরণের চেয়ে তাকে নিয়ে নিজের কল্পনাই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? আপনি কি বারবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন কিংবা তার প্রতিটি কথার অর্থ খুঁজছেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—আপনি কি এই চিন্তাগুলো বন্ধ করতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না?
যদি এমন অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং এতে আপনার কষ্ট বাড়তে থাকে, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে না নেওয়াই ভালো। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
প্রেম নয়, সমস্যা হতে পারে ‘আটকে যাওয়া’
প্রেম মানুষের জীবনে আনন্দ আনে, সম্পর্ক তৈরি করে, কখনও জীবনের অর্থও বাড়িয়ে দেয়। তাই তীব্র অনুভূতি হলেই সেটাকে অস্বাভাবিক বলে ফেলা ঠিক নয়।
কিন্তু যখন একজন মানুষকে ঘিরে আপনার পুরো দিন, মেজাজ, কল্পনা আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ঘুরতে শুরু করে; যখন তার সামান্য আচরণেই আপনার ভালো থাকা বা খারাপ থাকা নির্ভর করে; যখন নিজের কাজ, ঘুম, বন্ধুত্ব কিংবা স্বাভাবিক জীবন পিছিয়ে যায়—তখন একটু থামা দরকার।
হয়তো তখন নিজেকেই প্রশ্ন করা যায়—‘আমি কি মানুষটিকে ভালোবাসছি, নাকি তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক অনিশ্চিত কল্পনার মধ্যে আটকে আছি?’
এই পার্থক্য বোঝা সহজ নয়। তবে বোঝা গেলে নিজের অনুভূতিকেও একটু পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব।
কারণ ভালোবাসা যতই গভীর হোক, সেটি যদি আপনাকে নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে শুধু ‘প্রেম’ শব্দ দিয়ে পুরো গল্পটা বোঝানো হয়তো আর যথেষ্ট নয়।
ভালোবাসা আপনাকে কাছে টানতে পারে। কিন্তু সুস্থ ভালোবাসায় আপনি নিজেকেও হারিয়ে ফেলেন না।