ভাবুন তো, এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি আপনাকে চেনেনই না। অথচ তার বিয়ে কবে, কার সঙ্গে সম্পর্ক, বিচ্ছেদ হলো কি না, সন্তান কেমন আছে—এসব জানতে আপনার বেশ আগ্রহ। এমনকি তার জীবনে কিছু ঘটলে তা নিয়ে পরিচিত কারও জীবনের ঘটনার মতোই আলোচনা করছেন।
সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রে এমনটা খুবই স্বাভাবিক। তাদের বিয়ে, সন্তান, বিচ্ছেদ কিংবা প্রেমের খবর লাখো মানুষ আগ্রহ নিয়ে অনুসরণ করে। প্রশ্ন হলো, যাদের সঙ্গে আমাদের কোনও বাস্তব সম্পর্ক নেই, তাদের এতটা আপন মনে হয় কেন?
মনোবিজ্ঞান ও গণমাধ্যম গবেষণায় এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা আছে—প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ। ১৯৫০-এর দশকে ডোনাল্ড হর্টন ও রিচার্ড ওহল এই ধারণাটি সামনে আনেন। এর অর্থ হলো, কোনও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একতরফা, বন্ধুত্বসদৃশ সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি হওয়া। নিয়মিত কাউকে দেখতে দেখতে এবং তার জীবন সম্পর্কে জানতে জানতে আমাদের মনে হতে পারে, আমরা তাকে বেশ ভালোভাবেই চিনি।
একসময় এই অভিজ্ঞতা তৈরি হতো টেলিভিশন, সিনেমা কিংবা পত্রিকার মাধ্যমে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিষয়টিকে আরও তীব্র করেছে। একজন তারকা কী খাচ্ছেন, কোথায় ঘুরছেন, পরিবারের সঙ্গে কী করছেন, প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে কী ভাবছেন—এসব মুহূর্ত সরাসরি আমাদের ফোনের পর্দায় চলে আসে। ফলে দূরের মানুষটিও ধীরে ধীরে মানসিকভাবে পরিচিত বলে মনে হতে থাকে।
এখানে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশেরও ভূমিকা আছে। ৪২৯ জন সেলিব্রিটি-অনুসারীর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, তারকারা কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করলে অনুসারীদের মধ্যে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বাড়ে। অর্থাৎ সেলিব্রিটির একটি ব্যক্তিগত ছবি, সম্পর্কের কথা কিংবা জীবনের ছোটখাটো গল্প আমাদের মনে এমন এক ধরনের পরিচিতির অনুভূতি তৈরি করতে পারে, যা বাস্তব সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে কিছুটা মিলে যায়।
তবে এই সম্পর্ক সবসময় ভালো লাগার জায়গায় থেমে থাকে না। কাউকে যত বেশি দেখা হয়, তার এমন কিছু দিকও তত বেশি চোখে পড়ে, যা আমাদের অপছন্দ হতে পারে। ফলে ভক্ত থেকে কেউ কেউ ‘অ্যান্টি-ফ্যান’-এও পরিণত হন। অর্থাৎ সেই ব্যক্তিকে পছন্দ না করেও তার কর্মকাণ্ড নিয়মিত অনুসরণ করতে থাকেন। গবেষণায় এমন প্রবণতারও দেখা মিলেছে।
আর এখানেই বিষয়টি শুধু মনোবিজ্ঞানের মধ্যে আটকে থাকে না, জড়িয়ে যায় ব্যবসার সঙ্গেও। কাউকে ‘চেনা চেনা’ মনে হলে তার কথা আমরা বেশি মন দিয়ে শুনতে পারি, তার ওপর আস্থাও তৈরি হতে পারে। এই ঘনিষ্ঠতার অনুভূতিকে কাজে লাগাতে পারে বিপণনশিল্প। ব্যক্তিগত, আন্তরিক ও নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে অনলাইনে সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি করা যায়, যা অনুসারীদের সম্পৃক্ততা এবং ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ আপনার কাছে একজন তারকার সকালের নাশতার ছবি হয়তো স্রেফ একটি ছবি। কিন্তু একই ছবি সেই তারকার সঙ্গে আপনার মানসিক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। আর এই মনস্তাত্ত্বিক ঘনিষ্ঠতার অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে।
তাই সেলিব্রিটিদের বিয়ে, বিচ্ছেদ, সন্তান কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে আগ্রহী হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিয়মিত দেখা একজন মানুষকে আমাদের মস্তিষ্ক পরিচিত করে তুলতে পারে—যদিও বাস্তবে তিনি আমাদের জীবনের অংশ নন।
তবে পরেরবার কোনও তারকার ব্যক্তিগত জীবনের খবর দেখতে দেখতে এক মুহূর্ত থামুন। ভাবুন—আমি কি সত্যিই তাকে চিনি, নাকি নিয়মিত দেখার কারণে আমার মস্তিষ্কের কাছে তিনি শুধু একজন পরিচিত মানুষ হয়ে উঠেছেন?
আর সেই পরিচিতির অনুভূতিটাই হয়তো কারও কাছে আপনার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস—আপনার মনোযোগ।