ছোটবেলায় রাতে ঘুমানোর আগে বিছানার নিচে উঁকি দিয়েছেন কখনও?
আলো নিভিয়ে দেওয়ার পর মনে হয়েছে, দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে? আলমারির ভেতর কিছু একটা লুকিয়ে আছে? কিংবা রাতে হঠাৎ কোনও শব্দ শুনে চাদরটা মুখের ওপর টেনে নিয়েছেন?
বড় হয়ে এসব মনে পড়লে এখন হয়তো হাসি পায়। ভাবি, তখন এত ভয় পাওয়ার কী ছিল!
কিন্তু সত্যিই কি সেই ভয়গুলো চলে গেছে?
হয়তো পুরোপুরি নয়। শৈশবের ভয় অনেক সময় বয়সের সঙ্গে হারিয়ে যায় না; শুধু তার চেহারাটা বদলে যায়।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘বাডি’ নামের একটি ভৌতিক সিনেমা এই পুরোনো ভয়গুলোকেই অন্যভাবে সামনে এনেছে। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি তুলতুলে কমলা রঙের ইউনিকর্ন। দেখলে মনে হবে, শিশুদের বিনোদনের জন্য বানানো মিষ্টি কোনও চরিত্র। কিন্তু আসলে সে ভয়ংকর এক দানব।
এই অদ্ভুত বৈপরীত্যটাই সিনেমাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। কারণ ছোটবেলার পৃথিবীও অনেকটা এমন ছিল—বাইরে সবকিছু রঙিন, পরিচিত ও নিরাপদ; আবার তার আড়ালেই ছিল অন্ধকার আর ভয়।
বিছানার নিচের দানবটা গেল কোথায়?
শৈশবে ভয় পাওয়ার কারণ অনেক সময় খুব ছোটখাটো বিষয়। অন্ধকার, অপরিচিত মানুষ, একা ঘুমানো কিংবা বাবা-মাকে চোখের আড়াল হওয়া।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়গুলোর তালিকাও বদলায়।
বিছানার নিচের দানবের জায়গা নেয় চোর-ডাকাতের ভয়। দরজা বন্ধ করার পরও বারবার তালা পরীক্ষা করেন। ছোটবেলায় অপরিচিত মানুষকে ভয় পাওয়ার জায়গায় বড় হয়ে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ভয়টা হারিয়ে না গিয়ে অন্য রূপ নিতে পারে।
মৃত্যুর কথা শিশুর মাথায় কখন আসে?
শিশুরা একসময় বুঝতে শুরু করে, মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। সাধারণত ছয় বছর বয়সের দিকে মৃত্যুর ধারণাটা তাদের কাছে আরও পরিষ্কার হতে শুরু করে।
তখন ভয়টা হতে পারে—‘মা যদি মারা যান?’
আর বড় হয়ে একই ভয় অন্যভাবে ফিরে আসে—‘আমার কিছু হলে?’ কিংবা ‘আমার প্রিয় মানুষটির যদি কিছু হয়?’
প্রশ্ন বদলায়, বয়স বদলায়, কিন্তু হারানোর ভয়টা থেকে যায়।
প্রিয় খেলনাটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ছোটবেলায় একটা পুতুল, খেলনা বা কম্বল অনেক শিশুর কাছেই শুধু একটা জিনিস থাকে না। সেটার সঙ্গে তৈরি হয় গভীর এক ধরনের সম্পর্ক।
শিশুরা অনেক সময় জড়বস্তুকেও জীবন্ত কিছু হিসেবে ভাবতে পারে। মনে করতে পারে, প্রিয় খেলনাটা তাদের বুঝতে পারে, রক্ষা করতে পারে কিংবা তার নিজের কোনও বিশেষ ক্ষমতা আছে।
মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের চিন্তাকে ‘ম্যাজিক্যাল থিংকিং’ বলা হয়।
বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জাদুবিশ্বাসী চিন্তা কমে যায়। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কের একটা প্রবণতা থেকে যায়—চারপাশের ঘটনা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে অর্থ বা সম্পর্ক খুঁজে নেওয়া।
তাই ছোটবেলার সেই ভয়গুলোকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেগুলো ছিল তখনকার শিশুমনের পৃথিবীকে বোঝার একটা উপায়।
একই শৈশবে আনন্দ আর ভয়
শৈশব মানেই শুধু খেলাধুলা আর কার্টুন নয়।
একদিকে ছিল রঙিন টেলিভিশন, প্রিয় কার্টুন চরিত্র, খেলনা আর রূপকথা। অন্যদিকে ধীরে ধীরে জানা হচ্ছিল—মানুষ অসুস্থ হয়, কেউ হারিয়ে যেতে পারে, কেউ মারা যায়, সব মানুষ ভালো নয়।
সবচেয়ে কঠিন সত্যটাও একসময় সামনে আসে—যাদের আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তারাও চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবেন না।
শিশুর মন তাই একই সময়ে দুটো পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হয়।
একটা পৃথিবী নিরাপদ ও আনন্দের। আরেকটা পৃথিবী অজানা এবং ভয়ংকর।
‘বাডি’র মতো ভৌতিক গল্প সেই দ্বিতীয় পৃথিবীটাকেই সামনে আনে। যে চরিত্রকে দেখতে মিষ্টি, তার ভেতরেই যদি ভয়ংকর কিছু লুকিয়ে থাকে—এই ধারণাটাই শৈশবের সেই পুরোনো অস্বস্তিকে ফিরিয়ে আনে।
বড় হয়ে ভয়ংকর সিনেমা দেখতে ভালো লাগে কেন?
এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে।
ছোটবেলায় যে ভয়গুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করত, বড় হয়ে আমরা সেগুলোকেই ইচ্ছা করে সিনেমার পর্দায় দেখতে বসি।
অন্ধকার, মৃত্যু, হারিয়ে যাওয়া, একা হয়ে যাওয়া—এসব ভয়কে তখন গল্পের মধ্যে দেখা যায়। চাইলে সিনেমা বন্ধ করে উঠে যাওয়া যায়। অর্থাৎ ভয়টা থাকে, কিন্তু পরিস্থিতিটা থাকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
এ কারণেই ভৌতিক গল্প কখনও কখনও অদ্ভুত এক স্বস্তিও দিতে পারে। নিজের পুরোনো ভয়কে বাইরে থেকে দেখা যায়। বুঝতে পারি, ছোটবেলায় যে অন্ধকারটাকে এত ভয় পেতাম, সেটার কিছু অংশ আসলে আমাদের মনের ভেতরেই ছিল।
হয়তো এ কারণেই ভৌতিক গল্প শুধু ভয় দেখায় না। কখনও কখনও নিজের ভয়কে চিনতেও সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত শৈশবের ভয়গুলো কোথায় যায়?
বিছানার নিচে আর দানব খুঁজি না। রাতে আলমারির দিকে তাকিয়েও বুক ধড়ফড় করে না। দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না, সেটাও আর ভাবি না।
কিন্তু হারানোর ভয়, একা হয়ে যাওয়ার ভয়, অজানাকে ভয় পাওয়ার অভ্যাস—এসব পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
শৈশব শেষ হয়। ভয়ও বদলে যায়। শুধু ভয় পাওয়ার কারণটা বড় হয়ে যায়।