ভিড় বাড়লে কি বদলে যায় মানুষের আচরণ?

একটা ঘরে মানুষ ক্রমেই বাড়ছে, অথচ জায়গা একই। ব্যক্তিগত পরিসর কমছে, বাড়ছে শব্দ, অস্বস্তি ও সংঘাত। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের আচরণ কি বদলে যেতে পারে?

প্রাণীদের ওপর করা কিছু পুরোনো গবেষণা এই প্রশ্নই সামনে এনেছিল। ইঁদুর ও বানরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড় তাদের সামাজিক আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—প্রাণীর আচরণ দেখে মানুষের আচরণ সম্পর্কে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

সম্প্রতি এক নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ জে. শার্পস অতিরিক্ত জনঘনত্ব নিয়ে করা এসব পুরোনো গবেষণা নতুন করে বিশ্লেষণ করেছেন। তার আলোচনায় উঠে এসেছে—পরিবেশ, সামাজিক চাপ ও ব্যক্তিগত পরিসরের সংকট কীভাবে আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই প্রশ্ন।

বানর থেকে ইঁদুর—ভিড়ের প্রভাব নিয়ে পুরোনো গবেষণা

প্রায় এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ প্রাণিবিদ স্যার সলি জাকারম্যান লন্ডন চিড়িয়াখানায় হামাদ্রিয়াস বেবুনের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন। বন্দিদশায় থাকা বানরগুলোর সংখ্যা তাদের জায়গার তুলনায় অনেক বেশি ছিল এবং পুরুষ-নারীর অনুপাতও ছিল অস্বাভাবিক।

ওই পরিবেশে বানরগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘাত ও আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যায়। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। তবে গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও ছিল স্পষ্ট—পরিবেশটি ছিল কৃত্রিম এবং বন্য পরিবেশে বানরদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে তা তুলনীয় নয়।

পরবর্তী সময়ে জন সি. ক্যালহুন ইঁদুর ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর ওপর অতিরিক্ত জনঘনত্বের প্রভাব নিয়ে একাধিক গবেষণা করেন। তার পরীক্ষায় দেখা যায়, অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে প্রাণীদের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ ব্যাহত হতে পারে। আক্রমণাত্মক আচরণ বাড়া, সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা এবং প্রজনন আচরণে পরিবর্তনের মতো বিষয়ও দেখা যায়।

ক্যালহুনের সবচেয়ে আলোচিত পর্যবেক্ষণগুলোর একটি ছিল ‘বিউটিফুল ওয়ানস’ নামে পরিচিত একদল পুরুষ ইঁদুর। তারা অন্য ইঁদুরের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ, লড়াই বা প্রজননে প্রায় কোনও আগ্রহ দেখাত না। বরং খাওয়া, ঘুমানো ও নিজেদের পরিচর্যায় সময় কাটাত।

তবে এই গবেষণাগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। পরীক্ষার পরিবেশ ছিল কৃত্রিম এবং এসব ফলাফল প্রাকৃতিক পরিবেশে একইভাবে পুনরাবৃত্তি করা যায়নি। তাই এগুলোকে মানুষের আচরণের সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

মানুষের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটতে পারে?

মানুষের সামাজিক ও মানসিক জগত প্রাণীদের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা মানুষের আচরণকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, যার সঙ্গে ইঁদুর বা বানরের আচরণের সরাসরি তুলনা চলে না।

তবে অতিরিক্ত ঘনবসতি ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক চাপ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা আলাদা করে গবেষণার বিষয় হতে পারে।

ব্যক্তিগত জায়গার অভাব, শব্দ, যানজট, দূষণ, অনিরাপত্তা, সম্পদের সংকট কিংবা প্রতিদিনের প্রতিযোগিতা মানুষের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। সেই চাপ বিরক্তি, অস্থিরতা বা সামাজিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটি নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।

তবে ‘বেশি মানুষ মানেই বেশি হিংস্রতা’—এমন সরল সমীকরণ বিজ্ঞান সমর্থন করে না। অপরাধ ও সহিংসতার সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক কাঠামো, মাদকসহ নানা বিষয় জড়িত। জনঘনত্ব ও অপরাধের সম্পর্কও সব জায়গায় একই নয়।

আসল সমস্যা হয়তো ভিড় নয়, পরিবেশ

একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মানুষ যদি পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত পরিসর, নিরাপত্তা, সামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত জীবনযাপনের সুযোগ পায়, তাহলে শুধু জনসংখ্যার ঘনত্বকে নেতিবাচক আচরণের কারণ বলা কঠিন।

অন্যদিকে একই ঘনত্বের পরিবেশে যদি অনিরাপত্তা, বৈষম্য, সম্পদের সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থাকে, তাহলে মানুষের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

তাই প্রশ্নটা শুধু ‘এক জায়গায় কত মানুষ বাস করছে’—এতটা সরল নয়। বরং ‘তারা কী ধরনের পরিবেশে বাস করছে’—এই প্রশ্নটি হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো গবেষণাগুলো আবার আলোচনায় কেন?

ক্যালহুনের ইঁদুরের গবেষণা কিংবা জাকারম্যানের বানর নিয়ে পর্যবেক্ষণ আজকের মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করার চূড়ান্ত সূত্র নয়। বরং এগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—পরিবেশ কি আচরণ বদলে দিতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রাণীর গবেষণা কিছু প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজন মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক গবেষণা।

অর্থাৎ ইঁদুরের খাঁচা দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ লেখা যাবে না। তবে সেই খাঁচা আমাদের নিজেদের তৈরি পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে পারে।

আমরা যে শহর তৈরি করছি

ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে অস্থির লাগা, যানজটে মেজাজ খারাপ হওয়া কিংবা নিজের জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা না পেয়ে বিরক্ত হওয়া—আধুনিক নগরজীবনের পরিচিত অভিজ্ঞতা।

এসবের জন্য শুধু জনসংখ্যাকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু নগরজীবনে মানুষের মানসিক ও সামাজিক প্রয়োজন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণীদের পুরোনো গবেষণাগুলো তাই হয়তো আমাদের একটি সরল উত্তর দেয় না; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করতে শেখায়—মানুষ বাড়ছে, কিন্তু আমরা কি একে অন্যের জন্য যথেষ্ট জায়গা তৈরি করছি?

কারণ পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যত বাড়ছে, শুধু বসবাসের জায়গাই নয়—মানসিক স্বস্তি, ব্যক্তিগত পরিসর ও সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার জায়গারও প্রয়োজন বাড়ছে।