ফুটবল কি আপনার ‘নেশা’ হয়ে গেছে?

‘আর কখনও ওদের খেলা দেখব না!’

প্রিয় দল হেরে গেলে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে এমন কথা নতুন কিছু নয়। রাগে, হতাশায়, অভিমানে মনে হয়—এই দল, এই খেলা, কিছুই আর দেখতে চাই না। এমনকি সপ্তাহান্তে ফুটবল বাদ দিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাও হয়ে যায়। কয়েক দিন সত্যিই খেলা দেখা বন্ধ থাকে। কোনও খেলার সূচি দেখা হয় না, দল কেমন করছে তার খবরও নেওয়া হয় না।

কিন্তু ম্যাচের দিন রাত হলেই কী যেন হয়!

ঘড়িতে রাত বাড়ছে। চোখে ঘুম। সকালে কাজ আছে—সেটাও জানা। তবু মোবাইলে একবার ম্যাচের সময়টা দেখে নেওয়া হয়। তারপর খেলার খবর, সম্ভাব্য একাদশ, আগের ম্যাচের ফল—সব মিলিয়ে ঘুমের পরিকল্পনা উধাও। মনে হয়, ‘আজ শুধু একটু দেখব।’

খেলা শুরু হলে সেই ‘একটু’ আর একটু থাকে না। প্রথমার্ধ শেষ—তবু গোল হয়নি, তাই দ্বিতীয়ার্ধ না দেখে ওঠা যায় না। দ্বিতীয়ার্ধেও গোল নেই? যোগ করা সময়টুকু অন্তত দেখতে হবে। আর যদি ম্যাচ জমে যায়, তখন রাত কয়টা বাজল—সেটা আর কে দেখে!

পরদিন ঘুমঘুম চোখে কাজ করতে করতে হয়তো মনে হয়, ‘গত রাতে না দেখলেই পারতাম।’ কিন্তু পরের ম্যাচ এলে আবার একই কাণ্ড।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ফুটবল কি সত্যিই এক ধরনের নেশা হয়ে যেতে পারে?

মনোবিজ্ঞানী ড্যামিয়েন পিয়ার্স নিজের এমন অভিজ্ঞতা থেকেই প্রশ্নটি তুলেছেন। তার লেখার সূত্র ধরে বিষয়টি খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, ফুটবল-সমর্থনকে এখনও স্বীকৃত আচরণগত আসক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। মানসিক রোগ নির্ণয়ের ডিএসএম-৫ বা আইসিডি-১১-তেও ‘ফুটবল আসক্তি’ নামে কোনও আলাদা রোগ নেই। তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাসিমো লানজারো যুক্তি দিয়েছেন, কিছু ফুটবলপ্রেমীর আচরণ আচরণগত আসক্তির কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।

যেমন—বারবার একই কাজ করা, খেলা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকা, না করতে চাইলেও করে যাওয়া, থামার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া, জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অবহেলা করা এবং ক্ষতি হচ্ছে বুঝেও সেই আচরণ চালিয়ে যাওয়া। এমনকি সম্পর্কও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিন্তু ফুটবলেই বা এমন কী আছে, যা মানুষকে বারবার ফিরিয়ে আনে?

গোল যত কম, অপেক্ষা তত বেশি

ফুটবলের একটি বিশেষত্ব হলো—এখানে গোল খুব বেশি হয় না। ক্রিকেট বা রাগবির মতো প্রতি মুহূর্তে স্কোর বদলায় না। ফলে একটি গোলের মূল্যও অনেক বেশি মনে হয়।

মনোবিজ্ঞানে পরিচিত একটি ধারণা হলো— দুর্লভতার প্রভাব। কোনও জিনিস যত কম পাওয়া যায়, মানুষ অনেক সময় সেটিকে তত বেশি মূল্যবান মনে করে। ফুটবলের গোলও অনেকটা তেমন।

একটি গবেষণায় গ্লাসগো রেঞ্জার্সের নয়জন সমর্থককে মস্তিষ্কের স্ক্যানারের মধ্যে রেখে তাদের দলের গোল করা, অল্পের জন্য গোল মিস করা এবং মাঝমাঠে স্বাভাবিকভাবে বল চালানোর দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। গোলের দৃশ্য দেখার সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট অংশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অর্থাৎ একটি গোল শুধু স্কোরবোর্ডে সংখ্যা বাড়ায় না, সমর্থকের মস্তিষ্কেও আনন্দের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

কে কখন গোল করবে, কেউ জানে না

ফুটবলের দ্বিতীয় বড় আকর্ষণ—অনিশ্চয়তা।

ম্যাচের শুরুতে শক্তিশালী দল এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল হঠাৎ জিতে যেতে পারে। শেষ মিনিটের একটি গোল পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারে।

মস্তিষ্ক এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরস্কার কখন আসবে তা অনিশ্চিত হলে মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট অংশ অনেক সময় আরও সক্রিয় হয়। মনোবিজ্ঞানে এটিকে অনিশ্চিত পুরস্কারের বিন্যাস হিসেবে দেখা হয়। জুয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে—প্রতিবার পুরস্কার আসে না, কিন্তু পরেরবার আসতে পারে।

ফুটবলও প্রতিটি ম্যাচে সেই ‘হয়তো এবার’ অপেক্ষা তৈরি করে। গোল হবে কি হবে না, শেষ মুহূর্তে কী ঘটবে—এই অনিশ্চয়তাই দর্শককে আটকে রাখে।

গোল হয়নি, তবু মস্তিষ্ক থামে না

ফুটবলের আরেকটি শক্তিশালী কৌশল যেন—অল্পের জন্য না পাওয়া।

বল পোস্টে লেগে ফিরে এসেছে। নিশ্চিত গোল মনে হওয়া শট শেষ মুহূর্তে বাইরে চলে গেছে। গোলরক্ষক অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

গোল হয়নি, কিন্তু উত্তেজনা কি কমেছে? বরং অনেক সময় আরও বেড়ে যায়। মনে হয়, ‘পরেরবার ঠিকই হবে।’

গবেষণায় রেঞ্জার্স সমর্থকদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, গোলের সময় মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট অংশ সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি অল্পের জন্য গোল না হওয়ার সময় মস্তিষ্কের অন্য একটি অংশও সক্রিয় হয়। গবেষকদের মতে, এটি আবেগঘন ঘটনার প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থাৎ ফুটবলের আকর্ষণ শুধু যা ঘটেছে, তাতে নয়—যা ঘটতে পারত, তার অপেক্ষাতেও।

খেলা শেষ হলেও ফুটবল শেষ হয় না

আগে প্রিয় দল হেরে গেলে মন খারাপ হতো। ম্যাচ শেষ, গল্পও শেষ। পরের খেলা না আসা পর্যন্ত ফুটবল থেকে খানিকটা দূরে থাকা যেত।

এখন সেই সুযোগ কোথায়?

মুঠোফোনে সারাক্ষণ খেলার খবর, পরিসংখ্যান, পুরোনো গোলের ভিডিও, খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা—সবকিছু হাতের কাছে। একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও ফুটবল যেন পর্দা থেকে সরে যায় না।

মনোবিজ্ঞানী অ্যাডাম অল্টার এটিকে ফুটবলের ‘বাহক’ হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ ফুটবল নিজে যতটা মানুষকে টানে, মুঠোফোন সেই টানকে বারবার সামনে এনে আরও সক্রিয় রাখে।

তাই ফুটবল ভালোবাসা কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন খেলার কারণে ঘুম, কাজ, পরিবার বা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; যখন বারবার সিদ্ধান্ত নিয়েও আপনি থামতে পারছেন না; কিংবা প্রিয় দলের জয়-পরাজয় আপনার মেজাজ ও দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করছে।

ফুটবল হয়তো ৯০ মিনিটের খেলা। কিন্তু তার আগে আছে অপেক্ষা, পরে আছে বিশ্লেষণ—আর মাঝখানে আছে গোল, অনিশ্চয়তা ও অল্পের জন্য হারানো অসংখ্য সম্ভাবনা।

তাই হয়তো হারার পর আমরা বলি—‘আর দেখব না। কিন্তু পরের ম্যাচের দিন, ঠিক সময়েই আবার পর্দার সামনে বসে যাই।

/এম/